নিশান

প্রাইড মান্থের ইতিহাস: প্রতিরোধের উদযাপন

সোহম কিংশুক মণ্ডল

​প্রতি বছর জুন মাস এলেই আমরা দেখতে পাই ইউরোপের বহু প্রধান শহরের রাস্তা রংধনু রঙে সেজে ওঠে, কর্পোরেট ব্র্যান্ডগুলোর লোগোগুলো সাময়িকভাবে 'রংধনু'র রূপ নেয়, প্রাইড ওয়াকের জোয়ারে ভেসে যায় চারিদিক। কিন্তু এই জাঁকজমকপূর্ণ উৎসবের আড়ালে লুকিয়ে আছে ১৯৬৯ সালের এক রাতের রক্তক্ষয়ী প্রতিরোধের ইতিহাস। 'প্রাইড'-এর যাত্রা কোনো কর্পোরেট স্পনসরশিপ, সরকারি সহায়তা কিংবা উৎসবের মধ্যে দিয়ে শুরু হয়নি, বরং তা শুরু হয়েছিল নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে রাখতে রাখতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া কয়েকজন প্রান্তিক মানুষের ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করার সিদ্ধান্তের মধ্যে দিয়ে। আজকের দিনে একদিকে যখন এলজিবিটিকিউ+ কমিউনিটির মানুষদের উদ্‌যাপন করা হচ্ছে, তখন অন্যদিকে ভারতসহ বিভিন্ন দেশের আইনসভায় তীব্র দমনমূলক নীতি নির্ধারণ করা হচ্ছে। এই সময়ে দাঁড়িয়ে তাই আগামী দিনের লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যেতে 'প্রাইডের' ইতিহাসকে ফিরে দেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
​১৯৬৯ সালের বিস্ফোরণ কেন অনিবার্য ছিল, তা বুঝতে হলে তার কয়েক দশকের পরিস্থিতি অনুধাবন করা প্রয়োজন। বিংশ শতকের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সমকামী ও রূপান্তরকামীদের ওপর চরম নিপীড়ন চলত। এটি ছিল 'ল্যাভেন্ডার স্কেয়ার' ও 'রেড স্কেয়ার'-এর যুগ। ঠান্ডা যুদ্ধের সময়কালে ম্যাককার্থির কমিউনিস্ট-বিরোধী অভিযানের (রেড স্কেয়ার) সমান্তরালে চলা এক চক্রান্ত, যেখানে হাজার হাজার সরকারি কর্মচারীকে সমকামী সন্দেহে চাকরি থেকে বরখাস্ত ও হেনস্থা করা হয়েছিল (ল্যাভেন্ডার স্কেয়ার)। ম্যাককার্থির বয়ান ছিল - অধিকাংশ কমিউনিস্টরা সমকামী ও রূপান্তরকামী এবং তারা দেশের নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক। "থ্রি-আর্টিকেল ল" আইন অনুযায়ী একজন ব্যক্তিকে তার জন্মগত লিঙ্গ পরিচয়ের সাথে মিল রেখে অন্তত তিনটি পোশাক পরতে হতো। পুরুষ মনে হওয়া কোনো ব্যক্তির ড্র্যাগ (Drag) সাজা বা মেকআপ করা, কিংবা নারী মনে হওয়া কোনো ব্যক্তির জিপার-যুক্ত ট্রাউজার পরা ছিল গ্রেফতারির জন্য যথেষ্ট কারণ। শুরুর দিকের সমকামী অধিকার আন্দোলনগুলো - যা "হোমোফাইল আন্দোলন" (Homophile Movement) নামে পরিচিত ছিল, তারা এই কারণেই একটি কৌশল অবলম্বন করেছিল। ম্যাটাচিন সোসাইটি (Mattachine Society, ১৯৫০) এবং ডটার্স অফ বিলিটিস (Daughters of Bilitis, ১৯৫৫)-এর মতো সংগঠনগুলো হেটেরোসেক্সুয়াল সমাজকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে, সমকামীরাও সমাজের অন্যসব মানুষের মতোই সাধারণ নাগরিক। তারা ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে প্রতি বছর ৪ঠা জুলাই ফিলাডেলফিয়ার ইন্ডিপেন্ডেন্স হলের সামনে "অ্যানুয়াল রিমাইন্ডারস" (Annual Reminders) নামে নীরব সমাবেশের আয়োজন করত। কিন্তু এই পিসফুল আবেদনের মধ্যে নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে রাখতে রাখতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল একদল যুবসমাজ। নিউ ইয়র্ক জেগে ওঠার আগেই, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিরোধের আগুন জ্বলে উঠেছিল। এখানে দুটি ঘটনা উল্লেখযোগ্য -
​১) লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি ডোনাটের দোকানে পুলিশি হয়রানির বিরুদ্ধে কুইয়ার তরুণরা রুখে দাঁড়ায়।
২) সান ফ্রান্সিসকোর এলাকায় পুলিশি নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে রূপান্তরকামী নারীরা অফিসারের মুখে গরম কফি ছুড়ে মারে এবং ডাইনারটি ভাঙচুর করে। এটি ছিল কয়েক দিনব্যাপী চলা গণপ্রতিরোধ।
​এরপরেই ১৯৬৯ সালের ২৮শে জুন এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে, নিউ ইয়র্কের গ্রিনিচ ভিলেজের ক্রিস্টোফার স্ট্রিটের 'স্টোনওয়াল ইন'-নামক একটি বারে। অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে এই বারটি পরিচালিত হতো মূলত মাফিয়াদের দ্বারা, যারা পুলিশদের ঘুষ দিয়ে বারটিকে চালু রাখত। এই প্রতিকূলতার মাঝেও বারটি ছিল এলজিবিটিকিউ+ কমিউনিটির মানুষদের জন্য নিজেদের কমুনিটির মানুষদের খুঁজে পাওয়ার জায়গা। ২৮শে জুন রাতে নিউ ইয়র্ক পুলিশ যখন আচমকা বারটিতে রেইড বা হানা দেয়, কিন্তু সেই রাতে চেনা চিত্রনাট্য বদলে যায়।
​ভেতরের ভিড় পুলিশকে সহযোগিতা করতে অস্বীকার করে। গ্রাহকরা আইডি কার্ড দেখাতে বা বাথরুমে গিয়ে শারীরিক পরীক্ষা করাতে রাজি হয় না। পুলিশ যখন গ্রেপ্তারকৃতদের প্রিজন ভ্যানে তুলতে শুরু করল, বারের বাইরে ক্রিস্টোফার স্ট্রিটে শয়ে শয়ে মানুষ জড়ো হতে লাগল। মুহূর্তের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ বদলে যায় গণ-বিক্ষোভে। পুলিশের দিকে বৃষ্টির মতো খুচরো পয়সা ছুড়ে মারা হয়, যা ছিল পুলিশি দুর্নীতির বিরুদ্ধে এক প্রতীকী চড়। যে কুইয়ার সমাজকে পুলিশ অত্যন্ত দুর্বল ও ভীতু ভাবত, তাদের কয়েক শ' মানুষের প্রতিরোধের মুখে পড়ে পুলিশ পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং নিজেদের বাঁচানোর জন্য সেই বারের ভেতরেই ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। পরবর্তী সাতটি রাত ক্রিস্টোফার স্ট্রিট ছিল মুক্তিকামী মানুষের নিয়ন্ত্রণে। এই ঐতিহাসিক সত্যকে ভুলে গেলে চলবে না যে - স্টোনওয়াল আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন যারা, তারা একই সাথে বর্ণবাদ, আর্থিক বৈষম্য এবং লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার ছিলেন। এই লড়াইয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন - মার্শা পি. জনসন (একজন কৃষ্ণাঙ্গ রূপান্তরকামী নারী), সিলভিয়া রিভেরা (একজন লাতিনো রূপান্তরকামী নারী)।
​ঠিক এক বছর পর, ১৯৭০ সালের ২৮শে জুন, নিউ ইয়র্কের কর্মীরা আয়োজন করেন "ক্রিস্টোফার স্ট্রিট লিবারেশন ডে" মার্চ, যা প্রথম প্রাইড মার্চ বলে পরিচিত। এর পেছনের মূল মস্তিষ্ক ছিলেন ব্রেন্ডা হাওয়ার্ড (Brenda Howard), একজন উভকামী (Bisexual) অ্যাক্টিভিস্ট, যাকে "মাদার অফ প্রাইড" বলা হয়। ব্রেন্ডা এবং নবগঠিত গে লিবারেশন ফ্রন্ট (GLF) ও গে অ্যাক্টিভিস্ট অ্যালায়েন্স (GAA)-এর একদল বিপ্লবী কর্মী মিলে এমন এক পদযাত্রার পরিকল্পনা করেছিলেন যেখানে কোনো কর্পোরেট ফ্লোট থাকবে না বা কোনো স্পন্সর থাকবে না। "হোমোফাইল" থেকে "গে লিবারেশন" এবং পরবর্তীতে "প্রাইড" শব্দচয়নের এই পরিবর্তন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সমাজ যে পরিচয়কে 'লজ্জা' হিসেবে চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল, তার ঠিক বিপরীত শব্দ হিসেবে বেছে নেওয়া হলো 'প্রাইড' বা 'গর্ব'-কে। ১৯৭০-এর দশক জুড়ে এই পদযাত্রাগুলো সমগ্র বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকে। আমাদের অতি পরিচিত রেইনবো পতাকার প্রথম নকশা করেন সান ফ্রান্সিসকোর শিল্পী গিলবার্ট বেকার (১৯৭৮ সালে), যার আদি সংস্করণে আটটি রঙ ছিল, এবং প্রতিটি রঙ কুইয়ার জীবনের একেকটি উপাদানের প্রতীক (যেমন - হট পিঙ্ক যৌনতার জন্য, লাল জীবনের জন্য, কমলা নিরাময়ের জন্য, হলুদ সূর্যের আলোর জন্য, সবুজ প্রকৃতির জন্য, টারকোয়েজ শিল্পের জন্য, ইন্ডিগো সম্প্রীতির জন্য এবং ভায়োলেট আত্মার জন্য)।
​১৯৮০-এর দশকে যখন প্রাইড একটি বার্ষিক উৎসবে রূপ নিতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই এইচআইভি/এইডস (HIV/AIDS) মহামারীর আঘাত কুইয়ার সমাজের সমস্ত নিরাপত্তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে ফেলল। যখন হাজার হাজার সমকামী পুরুষ, রূপান্তরকামী নারী এবং কুইয়ার শিল্পী এই মরণব্যাধিতে মারা যাচ্ছিলেন, তখন রোনাল্ড রেগানের মার্কিন ফেডারেল সরকার চরম উদাসীনতা ও অবহেলা দেখায়। মূলধারার মিডিয়া এই সংকটকে বিদ্রূপের "GRID" (Gay-Related Immune Deficiency) বা সমকামী-সংশ্লিষ্ট রোগ বলে দাগিয়ে দিয়েছিল। এই চরম শোকের মাঝে প্রাইড মাসকে তার উৎসবের খোলস ছেড়ে আবারও তার আসল বিপ্লবী চেতনা ও আন্দোলনের পথে ফিরে যেতে হয়েছিল। উৎসবের পদযাত্রা রূপ নিয়েছিল শবযাত্রায়, প্রতিবাদ মিছিলে এবং অস্তিত্ব রক্ষার মরণপণ লড়াইয়ে। ACT UP (AIDS Coalition to Unleash Power)-এর মতো সংগঠনগুলো প্রাইডের মধ্যে এক ধরণের ক্ষুরধার থিয়েটার বা নাট্যধর্মী প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছিলেন। আন্দোলনকারীরা শুধু ব্যানার নিয়ে হাসিমুখে হাঁটতেন না, তাদের হাতে থাকত SILENCE = DEATH লেখা প্ল্যাকার্ড। তারা হোয়াইট হাউসের লনে প্রিয়জনদের চিতাভস্ম ছুড়ে মারতেন এবং প্যারেডের রাস্তার মাঝখানে মৃতদেহের মতো শুয়ে পড়ে বিশ্বকে বাধ্য করতেন এই মহামারীর দিকে তাকাতে। এইডস সংকটের দিনগুলো প্রমাণ করেছিল যে, হেটেরোসেক্সুয়াল মেজরিটির করুণা নয়, বরং কুইয়ার সমাজের নিজস্ব অধিকার রাস্তার লড়াইয়ের মাধ্যমেই ছিনিয়ে নিতে হবে। ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগ এবং ২০০০-এর শুরুতে এক বিশাল পরিবর্তন ঘটে যায়, দীর্ঘ লড়াইয়ের ফলে বিভিন্ন আইনি জয়, পশ্চিমা দেশগুলোতে সমকামী বিবাহের বৈধতার পর বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থাগুলি উপলব্ধি করল - এটি এক বিশাল ব্যবসার বাজার। ১৯৭০-এর দশকের সেই স্বল্প বাজেটের আন্দোলন রূপ নিল কোটি কোটি ডলারের কর্পোরেট জাঁকজমকে। এই যুগেই জন্ম হলো এক নতুন ধারণার, যাকে সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন "রেইনবো ক্যাপিটালিজম" (Rainbow Capitalism) বা "পিংকওয়াশিং" (Pinkwashing)। হঠাৎ দেখা গেল, যে কোম্পানিগুলো অতীতে সমকামী কর্মীদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করত বা সমকামী-বিরোধী নেতাদের ফান্ড দিত, তারাই এখন জুন মাসের ৩০ দিন নিজেদের লোগো রামধনু রঙে রাঙিয়ে কোটি টাকার নিজস্ব ব্যানার নিয়ে প্রাইড প্যারেডে নামছে। প্রগতিশীল কর্মীদের কাছে এই কর্পোরেট দখলদারি ছিল আন্দোলনের মূল চেতনার সাথে এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা। যখন কোনো অস্ত্র নির্মাণকারী সংস্থা, খনিজ তেল উত্তোলক কোম্পানি বা বড় কোনো ব্যাংক রামধনু ব্যানার নিয়ে রাস্তায় হাঁটে, তখন প্রাইড তার পলিটিক্যাল লড়াইয়ের ইতিহাসের ধার হারিয়ে ফেলে শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই থেকে কেবলই এক কর্পোরেট ব্র্যান্ডিংয়ে পরিণত হয়।
​আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বিশ্বজুড়ে ফ্যাসিবাদের উত্থানের সময়ে আমরা এক অত্যন্ত বিপজ্জনক ও অস্থির সময়ে এসে পৌঁছেছি। বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বিভিন্ন দেশে, এলজিবিটিকিউ+ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরু হয়েছে। এই বৈরী পরিবেশে কর্পোরেটদের সেই তথাকথিত কুইয়ার-প্রীতি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে। রক্ষণশীলদের সামান্য বয়কট বা রাজনৈতিক চাপের মুখে বহু বড় বড় রিটেল চেইন ও কোম্পানি রাতারাতি তাদের প্রাইড ক্যাম্পেইন বন্ধ করে দিয়েছে। এই পিছুটান আমাদের শিক্ষা দেয় এই বন্ধুত্ব আসলে ছিল নিজস্ব মুনাফা লাভের ধান্দা। ব্যবসার লাভ-ক্ষতির খতিয়ানে যখনই টান পড়বে, তারা মানবাধিকারের চেয়ে নিজেদের মুনাফাকেই আগে বেছে নেবে। আর এই কারণেই আজ বিশ্বজুড়ে এক নতুন আন্দোলন শুরু হয়েছে, যার লক্ষ্য প্রাইডের থেকে কর্পোরেট বিজ্ঞাপনের মোড়ক ছিঁড়ে ফেলে তার সেই আদি বৈপ্লবিক আত্মাকে ফিরিয়ে আনা। নিউ ইয়র্কের "কুইয়ার লিবারেশন মার্চ"-এর মতো বিকল্প পদযাত্রাগুলো এখন মূল কর্পোরেট প্যারেডের সমান্তরালে অনুষ্ঠিত হয়। এই মার্চগুলোতে কোনো কর্পোরেট টাকা বা ফ্লোট নেওয়া হয় না এবং পুলিশকে ইউনিফর্ম পরে মার্চ করতে দেওয়া হয় না। এই বিকল্প মঞ্চগুলো বিশ্বের সমকালীন অন্যান্য লড়াইয়ের সাথে হাত মেলায়, যেমন - 'ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার', অর্থনৈতিক সাম্য, নারীর শরীরের ওপর নিজস্ব অধিকার এবং সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরোধিতা।
​ভারতে কুইয়ার আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে আছে রাস্তার লড়াই এবং আইনি লড়াইয়ের ইতিহাস। প্রাক-ঔপনিবেশিক ভারতে লিঙ্গ ও যৌনতার ক্ষেত্রে এক ধরণের উদারবাদী ধারণা ছিল, যার প্রমাণ প্রাচীন গ্রন্থ, মন্দিরের স্থাপত্য এবং সুফি ও ভক্তি সাহিত্যের মধ্যে পাওয়া যায়। এর পরিবর্তন ঘটে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের হাত ধরে। ভিক্টোরিয়ান রক্ষণশীল মানসিকতা থেকেই ১৮৬০ সালে লর্ড মেকলের অধীনে যখন ভারতীয় দন্ডবিধি (Indian Penal Code বা IPC) তৈরি হয়, তখন তাতে ৩৭৭ ধারা (Section 377) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, এর মাধ্যমে সমকামিতাকে আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ বলে ঘোষণা করা হয়। ১৮৭১ সালের অপরাধী উপজাতি আইনের মাধ্যমে ব্রিটিশরা ভারতের ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়কে জন্মগত অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে। এর ফলে তাঁদের নাচ, গান, প্রকাশ্য চলাচল এবং নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় এবং পুলিশকে অবাধে তাঁদের গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা দেওয়া হয়। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হলেও, ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া ৩৭৭ ধারা এবং ট্রান্স-বিরোধী মানসিকতা রাষ্ট্র ও সমাজ বজায় রাখে। এই সময়ে সমকামিতা নিয়ে সমাজে এক চরম ভয়ের পরিবেশ বহাল ছিল। সমকামী মানুষদের জোর করে মানসিক হাসপাতালে পাঠানো, ইলেকট্রিক শক থেরাপি দেওয়া কিংবা বিয়ে করতে বাধ্য করার মতো ঘটনা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। নব্বইয়ের দশকে ভারতে এই নীরবতা ভাঙতে শুরু করে। এই সময়ে আন্দোলনটি আইনি ও সামাজিক স্তরে সংগঠিত রূপ নিতে থাকে। ১৯৯১ সালে এইডস বিরোধী আন্দোলনকারী সংস্থা ‘এবিভিএ’ (ABVA - AIDS Bhedbhav Virodhi Andolan) ভারতে প্রথম সমকামী অধিকারের পক্ষে একটি বিস্তারিত রিপোর্ট প্রকাশ করে, যার নাম ছিল "Less Than Gay"। তাঁরাই প্রথম ৩৭৭ ধারা বাতিলের দাবি তুলে আদালতে যান, যদিও তখন তা খারিজ হয়ে যায়। এই সময়েই ভারতের প্রথম কুইয়ার ম্যাগাজিন ‘বম্বে দোস্ত’ প্রকাশ পায়। ১৯৯৯ সালে আমাদের কলকাতার রাজপথে ভারতের তথা দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম প্রাইড মার্চ - ‘ফ্রেন্ডশিপ ওয়াক’ অনুষ্ঠিত হয়, যা আন্দোলনকে আমজনতার সামনে নিয়ে আসে। তখন এর নাম ‘প্রাইড প্যারেড’ ছিল না, মাত্র ১৫ জন সাহসী মানুষ হলুদ টি-শার্ট গায়ে দিয়ে হেঁটেছিলেন, যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ফ্রেন্ডশিপ ওয়াক’ (The Friendship Walk)। কার্গিল যুদ্ধের আবহে, চরম সামাজিক রক্ষণশীলতা ও পুলিশি হেনস্থার ভয়ের মুখে দাঁড়িয়ে সেই ১৫ জন মানুষের হাঁটা ছিল ভারতের এলজিবিটিকিউ+ (LGBTQ+) আন্দোলনের ইতিহাসের এক বড় মোড়। আসলে আমাদের রাজ্যের দীর্ঘদিনের বামপন্থী আন্দোলনের পরিবেশ ও প্রগতিশীলতার চর্চাই এই উদ্যোগ নেওয়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছিল। পরবর্তী এক দশকে বিভিন্ন ব্যক্তি, সংস্থা কলকাতা, দিল্লি, মুম্বাইসহ একাধিক শহরে 'প্রাইড প্যারেড'-এর উদ্যোগ নেন। একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই এই লড়াই আদালতের চৌহদ্দিতে প্রবেশ করে।
​১) ২০০১ সালে ‘নাজ ফাউন্ডেশন’ নামক একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা দিল্লি হাইকোর্টে ৩৭৭ ধারার বৈধতাকে challenge করে মামলা দায়ের করে। তাঁদের যুক্তি ছিল, এই আইন নাগরিকদের মৌলিক অধিকার এবং স্বাস্থ্যের অধিকার হরণ করছে।
২) ২০০৯ সালে দিল্লি হাইকোর্ট এক যুগান্তকারী রায়ে জানায় যে, প্রাপ্তবয়স্কদের পারস্পরিক সম্মতিতে তৈরি সমকামী সম্পর্ক কোনো অপরাধ নয়। ৩৭৭ ধারার এই অংশটি সংবিধান পরিপন্থী।
৩) ২০১৩ সালে রক্ষণশীল ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর আবেদনের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট (সুরেশ কুমার কৌশল বনাম নাজ ফাউন্ডেশন মামলায়) দিল্লি হাইকোর্টের রায় বাতিল করে দেয়। সুপ্রিম কোর্ট মন্তব্য করে যে, এলজিবিটিকিউ+ সম্প্রদায় হলো একটি "নগণ্য সংখ্যালঘু" এবং আইন বাতিলের কাজ আদালতের নয়, সংসদের।ধাক্কা খেলেও প্রগতিশীল আন্দোলনকারীরা লড়াই থামিয়ে দেননি। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের ফলে সুপ্রিম কোর্ট নিজের অবস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়।
৪) ২০১৪ সালে (NALSA Judgment) সুপ্রিম কোর্ট রূপান্তরকামী মানুষদের 'তৃতীয় লিঙ্গ' হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দেয় এবং শিক্ষা ও চাকরিতে তাঁদের সংরক্ষণের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়।
৫) ২০১৭ সালে (গোপনীয়তার অধিকার) ‘কে. এস. পুট্টস্বামী’-মামলায় সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় যে, একজন মানুষের নিজস্ব যৌনতা এবং সঙ্গী নির্বাচন তাঁর মৌলিক ‘গোপনীয়তার অধিকার’ (Right to Privacy)-এর অংশ। এই রায় ৩৭৭ ধারা বাতিলের রাস্তা পরিষ্কার করে দেয়।
৬) ২০১৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তারিখে পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ ‘নবতেজ সিং জোহর’ মামলায় ঐতিহাসিক রায় দিয়ে ৩৭৭ ধারার সমকামিতা-সংক্রান্ত অংশটি সম্পূর্ণ বাতিল করে। আদালত বলে, "সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন মানুষের একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।" সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট ভাষায় জানায় - ইতিহাসের ভুলের জন্য এলজিবিটিকিউ+ সম্প্রদায়ের কাছে রাষ্ট্রের ক্ষমা চাওয়া উচিত।
ভারতের এলজিবিটিকিউ+ (LGBTQ+) আন্দোলন যখন আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে ধাপে ধাপে এগিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ২০২৬ সালের মার্চ মাসে ভারতীয় সংসদে পাস হওয়া একটি নতুন সংশোধনী আইন ‘ট্রান্সজেন্ডার পার্সনস (প্রোটেকশন অফ রাইটস) অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট, ২০২৬’ পুরো আন্দোলনকে এক চরম ধাক্কা ও আইনি সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
​প্রগতিশীল অধিকার কর্মীদের মতে, এই সংশোধনীটি ২০১৪ সালের সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক ‘নালসা’ (NALSA) রায়ের চেতনাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে এক প্রকার 'নজরদারি’ ফিরিয়ে এনেছে। ২০১৯ সালের মূল আইনে যেটুকুই অধিকার অবশিষ্ট ছিল, ২০২৬-এর সংশোধনীতে রাষ্ট্র তার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। ‘নিজের লিঙ্গপরিচয় নিজে নির্ধারণের’ (Self-determination) অধিকার বিলোপ পেয়েছে এই সংশোধনীর মাধ্যমে। ২০১৯ সালের আইনের ৪(২) ধারাটি সম্পূর্ণ ডিলিট করে দেওয়া হয়েছে। আগে একজন মানুষ নিজের মানসিক তাগিদ থেকে নিজেকে রূপান্তরকামী বা ট্রান্সজেন্ডার হিসেবে পরিচয় দিতে পারতেন। নতুন আইনে সেই আইনি অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এখন থেকে কোনো ব্যক্তি চাইলেই জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছ থেকে ট্রান্সজেন্ডার পরিচয়পত্র পাবেন না। এর জন্য মুখ্য স্বাস্থ্য কর্মকর্তার (CMO) অধীনে একটি ‘মেডিকেল বোর্ড’ গঠন করা হবে। সেই মেডিকেল বোর্ডের জৈবিক পরীক্ষা ও ছাড়পত্রের ওপর ভিত্তি করেই জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সার্টিফিকেট দেবেন কি না তা ঠিক করবেন। এটি মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও শারীরিক মর্যাদার চরম লঙ্ঘন। ২০১৯ সালের আইনে ট্রান্সজেন্ডার শব্দের সংজ্ঞাটি উদার ছিল (যার জন্মকালীন লিঙ্গপরিচয় তাঁর মানসিক লিঙ্গপরিচয়ের সাথে মেলে না)। কিন্তু ২০২৬ সালের আইনে এই সংজ্ঞা ছোট করে কেবল দুটি নির্দিষ্ট ক্যাটাগরিতে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে -
​১. নির্দিষ্ট কিছু সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিচয় (যেমন - হিজড়ে, কিন্নর, আরাভানি, জোগতা ইত্যাদি)।
২. জন্মগত ইন্টারসেক্স শারীরিক বৈশিষ্ট্যযুক্ত মানুষ।
​এই সংকীর্ণ সংজ্ঞার কারণে যে সমস্ত রূপান্তরকামী পুরুষ (Trans men), নন-বাইনারি (Gender-fluid) বা কুইয়ার ব্যক্তিরা কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির অংশ নন বা যাঁদের কোনো জন্মগত ইন্টারসেক্স শারীরিক ত্রুটি নেই, তাঁরা সম্পূর্ণ আইনি সুরক্ষার বাইরে চলে গেলেন, কার্যত তাঁদের অস্তিত্বকেই মুছে দেওয়া হলো। এই সংশোধনীতে কিছু নতুন ধারা যুক্ত করা হয়েছে, যা আপাতদৃষ্টিতে সুরক্ষামূলক মনে হলেও বাস্তবে এর অপপ্রয়েরোর ভয় মারাত্মক -
​কেউ যদি বলপ্রয়োগ বা প্রতারণার মাধ্যমে কাউকে জোর করে ‘ট্রান্সজেন্ডার’ হিসেবে উপস্থাপন করায় বা অঙ্গহানি, হরমোন থেরাপি করায় তবে ১০ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আন্দোলনের কর্মীদের মতে, এই আইনের অস্পষ্ট ভাষার কারণে রূপান্তরকামী মানুষদের পারস্পরিক আশ্রয় নেওয়ার পারিবারিক নেটওয়ার্ক, সাহায্যকারী অভিভাবক, বা চিকিৎসকদের নিশানা করা হতে পারে। অথচ, ট্রান্স মানুষদের ওপর ঘটা সাধারণ শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের জন্য আগের ২ বছরের লঘু শাস্তির ঊর্ধ্বসীমা অপরিবর্তিতই রাখা হয়েছে। আইনটি পাস হওয়ার পরপরই দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়। বিভিন্ন বামপন্থী এবং প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল, ছাত্রসংগঠন, ব্যক্তিবর্গ এর প্রতিবাদে রাস্তায় নামেন এবং তাঁরা ২০২৬ সালের এই "ট্রান্স বিল অ্যামেন্ডমেন্ট" বাতিলের দাবিতে লড়াই এখনও চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০১৪ সালে কেন্দ্রে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরেই এলজিবিটিকিউ+ সম্প্রদায়ের মানুষদের উপর আক্রমণের ঘটনা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পিছনে কাজ করছে 'বিজেপি-আরএসএস'-এর চরম রক্ষণশীল এবং পিতৃতান্ত্রিক মনুবাদী চিন্তাভাবনা, যা নারীদের মতোই এলজিবিটিকিউ+ সম্প্রদায়ের মানুষদের সমাজের তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করে। আমেরিকায় স্টোনওয়াল দাঙ্গার নেতৃত্বে যেমন ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ ও লাতিনো রূপান্তরগামীরা, ভারতেও তেমনই মনে রাখা দরকার যে একজন কুইয়ার মানুষের লড়াই শুধুমাত্র তাঁর যৌন পরিচয়ের লড়াই নয়। তাঁর লড়াইটি একই সাথে সমাজকাঠামোয় তাঁর শ্রেণি অবস্থান এবং জাতিগত পরিচয়ের সাথে যুক্ত। উচ্চবিত্ত বা উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণির একজন সমকামী বা কুইয়ার পুরুষ কর্পোরেট সংস্থায় চাকরি পেয়ে বা ইংরেজি জানা এলিট কুইয়ার সার্কেলে যে সামাজিক নিরাপত্তা পান, একজন প্রান্তিক শ্রেণির, বস্তিবাসী বা শ্রমজীবী রূপান্তরকামী মানুষ সেই নিরাপত্তা পান না। উচ্চবিত্তদের কুইয়ারনেস যখন সুদৃশ্য ক্যাফে বা বারে উদ্‌যাপিত হয়, তখন গ্রামীণ বা মফস্বলের দরিদ্র কুইয়ার মানুষদের কপালে জোটে পারিবারিক হিংসা, জোরপূর্বক বিবাহ, অথবা অনাহারে দিন কাটানো। ভারতীয় সমাজের সবচেয়ে বড় অন্ধকার দিক হলো জাতপাত বা বর্ণপ্রথা, যা এই বিজেপি সরকারের আমলে নতুন করে বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। দলিত, আদিবাসী বা মুসলিম সম্প্রদায়ের একজন কুইয়ার মানুষের ওপর নিপীড়নের মাত্রা দ্বিগুণ বা তিনগুণ। একজন দলিত ট্রান্সজেন্ডার নারী কেবল তাঁর লিঙ্গ পরিচয়ের জন্য নয়, বরং তাঁর জাতিগত পরিচয়ের জন্যও সমাজ এবং উচ্চবর্ণের আধিপত্যবাদীদের দ্বারা চরম শারীরিক ও যৌন হিংসার শিকার হন। অথচ, ভারতের কুইয়ার আন্দোলনের প্রথম সারির নেতৃত্ব ও আইনি লড়াইয়ের চালিকাশক্তি দীর্ঘদিন ধরে থেকেছে প্রধানত উচ্চবর্ণের এবং ইংরেজি শিক্ষিত এলিটদের হাতে। এই কারণে দলিত-কুইয়ার অ্যাক্টিভিস্টরা বারবার দাবি তুলেছেন যে - জাতপাত বিরোধী লড়াই বাদ দিয়ে ভারতে কোনো প্রকৃত কুইয়ার মুক্তি সম্ভব নয়। ভারতবর্ষে এলজিবিটিকিউ+ সম্প্রদায়ের মানুষের নিজস্ব অধিকার অর্জনের লড়াই যে ফ্যাসিস্ট বিজেপি সরকারের বিভিন্ন শ্রমিক, কৃষক বিরোধী নীতি বিরোধী লড়াইয়ের সাথে বিচ্ছিন্ন নয় - এই বিষয়ে ভারতের এলজিবিটিকিউ+ কমিউনিটির মানুষরা যথেষ্ট সচেতনতা দেখিয়েছেন। N.R.C., C.A.A., S.I.R.-এর মাধ্যমে মুসলিমদের বেনাগরিক করার চক্রান্তের বিরুদ্ধে দিল্লিতে বা পাঞ্জাবের কৃষক আন্দোলনে তাই এলজিবিটিকিউ+ কমিউনিটির মানুষরা নিজেদের ফ্ল্যাগ নিয়ে বড় সংখ্যায় উপস্থিত থেকেছেন।
​আজকে ভারতের মেট্রো শহরগুলোতে - কলকাতা, দিল্লিi, মুম্বাই বা বেঙ্গালুরুতে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে প্রাইড প্যারেড হয়। কর্পোরেট সংস্থাগুলো জুনের শুরুতে তাদের লোগো রামধনু রঙে রাঙিয়ে তোলে। একে আপাত দৃষ্টিতে দেখলে যেমন ইতিবাচক মনে হয়, তেমনই এর পেছনে লুকিয়ে থাকা পুঁজিবাদী চাতুরী বা ‘পিঙ্কওয়াশিং’ (Pinkwashing) সম্পর্কেও সচেতন থাকা জরুরি। যে কর্পোরেট বা ব্র্যান্ডগুলো জুনে রামধনু লোগো ব্যবহার করছে, তারা কি সত্যিই কর্মক্ষেত্রে রূপান্তরকামী বা সমকামী মানুষদের জন্য বৈষম্যহীন পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছে? নাকি এটি কেবলই নিজস্ব মুনাফা লাভের খাতিরে এক মেকি সহানুভূতি? প্রগতিশীল আন্দোলনের কাজ হলো এই বাণিজ্যিকীকরণের ভিড়ে লড়াইয়ের আসল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যটিকে হারিয়ে যেতে না দেওয়া। এই চিন্তাভাবনা থেকেই ভারতেও বহু জায়গায় সম্পূর্ণভাবে "কর্পোরেট-ফান্ডিং"-মুক্ত প্রাইড প্যারেডের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
​আজকের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে তাই ‘প্রাইড মান্থ’ কেবল রাজপথে রামধনু পতাকা ওড়ানোর দিন নয়। এটি হলো সেই ইতিহাসকে স্মরণ করার দিন যা সামাজিক বয়কট ও পুলিশের লাঠি উপেক্ষা করে আজকের এইটুকু স্বাধীনতার রাস্তা তৈরি করে দিয়ে গেছে। উদ্‌যাপন তখনই সার্থক হবে, যখন এই আন্দোলনের প্রগতিশীল চেতনা শহর ছাড়িয়ে প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে এবং রাষ্ট্র প্রতিটি নাগরিককে তাঁর লিঙ্গপরিচয় ও যৌন-পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে পূর্ণ আইনি ও সামাজিক মর্যাদা দেবে।