ভালোবাসা প্রকৃত অর্থে কি?
দুটো প্রাণীর পরস্পর বিশ্বাস এবং স্নেহের এক নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে নেওয়া। যে অটুট সম্পর্কে দুজনের একে অপরের প্রতি থাকবে শ্রদ্ধা থাকবে তার সঙ্গে থাকবে পরস্পরের প্রতি যত্ন, নি:শর্ত দায়িত্ববোধ।
সর্বদা যে শারীরিক মিলনই ভালোবাসার পূর্ণতা দেবে এমনটা নয়; মানসিক এবং আত্মিক মিলন শারীরিক মিলনের থেকেও অনেক বেশি পবিত্র এবং দীর্ঘস্থায়ী সুদৃঢ় এক অটুট সুগভীর সম্পর্ক। প্রকৃতি জননী বৈচিত্র্যময়ী। কিন্তু, সমাজ সকলকে দেখে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর বা বাইনারি (নারী-পুরুষ) চশমা দিয়ে, যেখানে বৈচিত্র্যকে মেনে নেওয়ার কোনো জায়গা নেই।
সেই প্রকৃতির বুকে নানান ধরনের ভালোবাসার উদাহরণ আমরা দেখতে পাই। স্ট্রেইট সহ LGBTQIA+ নানা ধরনের ভালোবাসার রং সমৃদ্ধ করে আমাদের এই বিশাল প্রকৃতিকে।গরিলা ,পেঙ্গুইন ,শকুন থেকে শুরু করে শিম্পাঞ্জি,বাদুড়, ওয়ার্লাস, ফ্লেমিঙ্গো , জিরাফ ইত্যাদি প্রায় ১৫০০ বেশি প্রজাতির মধ্যে বিজ্ঞানীরা এই সব ধরনের বৈচিত্র্য এর সন্ধান পেয়েছেন ।
হিন্দু ধর্ম:-
পঞ্চদশ শতাব্দীর কৃত্তিবাসী রামায়ণে একটি চমৎকার নিদর্শন পাওয়া যায়। রাজা দিলীপ সন্তানহীন অবস্থায় মারা যাওয়ার পর তাঁর দুই বিধবা রানি একসঙ্গে জীবনযাপন শুরু করেন। শিবের আশীর্বাদে এবং তাঁদের পারস্পরিক প্রেমের মিলনের (সমকামী সম্পর্ক) ফলে তাঁদের এক সন্তানের জন্ম হয়। যেহেতু দুই 'ভগ' (যোনি)-এর মিলনে তাঁর জন্ম, তাই সেই সন্তানের নাম রাখা হয় 'ভগীরথ'। এই ভগীরথই পরে মর্ত্যে গঙ্গা নদী নিয়ে এসেছিলেন।
মিত্র ও বরুণ: প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যে (যেমন শতপথ ব্রাহ্মণ) মিত্র এবং বরুণ এই দুই দেবতাকে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাঁদের দুজনকে প্রায়শই একত্রে 'অর্ধচন্দ্র' হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা অনেকের মতে প্রাচীন ভারতে সমকামী পুরুষ জুটির একটি রূপক।
হরিহরের রূপ ও আয়াপ্পান: হিন্দু পুরাণে শিব এবং মোহিনীর (বিষ্ণুর নারী অবতার) মিলনের কথা উল্লেখ আছে। ভগবান বিষ্ণু মোহিনীর রূপ ধারণ করলে শিব তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হন এবং তাঁদের মিলনে ভগবান আয়াপ্পানের জন্ম হয়। এটি জেন্ডার ফ্লুইডিটি এবং প্রেমের বৈচিত্র্যের একটি বড় নিদর্শন।
এছাড়াও অর্ধনারীশ্বর একটি খুব সুন্দর নমুনা বলা যেতে পারে লিঙ্গ সাম্যের।
কামসূত্র (Kama Sutra): বাৎস্যায়নের 'কামসূত্র'-এ সমকামিতা নিয়ে অত্যন্ত খোলামেলা আলোচনা রয়েছে। এই গ্রন্থে 'তৃতীয় প্রকৃতি' নামে একটি অধ্যায় রয়েছে, যেখানে পুরুষে-পুরুষে বা নারীতে-নারীতে প্রেম ও যৌন সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে। সেখানে বিষয়টিকে কোনো পাপ বা অপরাধ হিসেবে দেখানো হয়নি, বরং এটি যে মানুষের যৌনতার একটি স্বাভাবিক বৈচিত্র্য এবং আনন্দের উপায়—তা স্পষ্টভাবে স্বীকার করা হয়েছে।
প্রাচীন ভাস্কর্য: খাজুরাহো, কোনার্ক এবং পুরীর মন্দিরের গায়ে এমন অনেক ভাস্কর্য খোদাই করা আছে, যেখানে নারী-নারী বা পুরুষ-পুরুষ জুটির গভীর প্রেম ও অন্তরঙ্গ মুহূর্ত ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মন্দিরের মতো পবিত্র জায়গায় এই ভাস্কর্যগুলো প্রমাণ করে যে, সমাজে এটি একটি স্বাভাবিক বিষয় ছিল।
খ্রিস্টধর্ম :-
প্রগতিশীল খ্রিষ্টানদের যুক্তি হলো—ঈশ্বর ভালোবাসার উৎস। বাইবেল জবরদস্তি, বলাৎকার, অসম ক্ষমতার সম্পর্ক (যেমন- দাস-মালিক) এবং লালসাকে পাপ বলে। কিন্তু দুজন মানুষের মধ্যে যদি পারস্পরিক সম্মতি, সম্মান, বিশ্বস্ততা এবং পবিত্র প্রেম থাকে, তবে তা লিঙ্গ নির্বিশেষে ঈশ্বরের আশীর্বাদপুষ্ট।
বাইবেলের 'বুক অফ স্যামুয়েল' (1 Samuel & 2 Samuel)-এ রাজা ডেভিড (দাউদ আঃ) এবং জোনাথনের মধ্যে এক অত্যন্ত গভীর, আবেগপূর্ণ এবং ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বর্ণনা রয়েছে। প্রগতিশীল স্কলাররা এটিকে প্রাচীন সমপ্রেমের একটি ধ্রুপদী উদাহরণ হিসেবে দেখেন।জোনাথনের মৃত্যুর পর ডেভিডের বিলাপটি বাইবেলে ঠিক এভাবে লেখা আছে:
"হে আমার ভাই জোনাথন, তোমার জন্য আমি বড়ই ব্যথিত! তুমি আমার কাছে অতি প্রিয় ছিলে। নারীদের প্রেমের চেয়েও তোমার প্রেম আমার কাছে অধিক বিস্ময়কর ছিল।" (2 Samuel 1:26)
বাইবেলের 'বুক অফ রুত'-এ দুই নারী, রুত এবং তাঁর শাশুড়ি নাওমির মধ্যে এক অটুট বন্ধনের কথা বলা হয়েছে। নাওমির স্বামী ও সন্তান মারা যাওয়ার পর রুত তাঁকে ছেড়ে যেতে অস্বীকার করেন এবং যে ভাষায় তিনি অঙ্গীকার করেন, তা আজও খ্রিষ্টানদের বিবাহ অনুষ্ঠানে পাঠ করা হয়:
"আমাকে ছেড়ে যাওয়ার জন্য জোরাজুরি কোরো না। তুমি যেখানে যাবে, আমিও সেখানে যাব; তুমি যেখানে থাকবে, আমিও সেখানে থাকব... একমাত্র মৃত্যু ছাড়া আর কিছুই আমাকে তোমার থেকে আলাদা করতে পারবে না।" (Ruth 1:16-17)
অনেকেই এই সম্পর্কটিকে নারীতে-নারীতে গভীর আত্মিক ও রোমান্টিক ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে দেখেন।
এছাড়া,স্কলাররা প্রমাণ করেছেন যে, ১৯৪৬ সালের আগে বাইবেলের কোনো অনুবাদে 'Homosexual' শব্দটি ছিলই না! সেন্ট পল মূলত সেই যুগে প্রচলিত শিশু কামুকতা (Pederasty), জোরপূর্বক দাসদের সাথে যৌনতা এবং পতিতাবৃত্তির বিরোধিতা করেছিলেন। দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যেকার সম্মতিকৃত, বিশ্বস্ত এবং ভালোবাসাপূর্ণ সমকামী সম্পর্ক (যা আধুনিক যুগে দেখা যায়) নিয়ে সেন্ট পল কিছুই বলেননি, কারণ সেই যুগে এর কোনো ধারণাই ছিল না।
ইসলাম ধর্ম:-
এই ধর্মমতে LGBTQIA+ এই বিষয়ে যথেষ্ট তর্ক এবং জটিলতা রয়েছে কারণ ইসলামে কঠোরভাবে সমকামিতা নিষিদ্ধ। তবে ইসলামের অনুসারীরা বিশ্বাস করেন সৃষ্টিকর্তা সকলকে ভালবাসতে শিখিয়েছেন। একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা, আনুগত্য, বিশ্বাস, সাহচর্য এইসব বিষয়ে উৎসাহ দেওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে বলা বাহুল্য কুরআনের একটি বহুল আলোচিত অধ্যায় লুতের জনগোষ্ঠীর ওপর আল্লাহ (ঈশ্বরের ) যে গজব এসেছিল সে প্রসঙ্গে আমরা কিছু বিশেষ আয়াতে দেখি
সূরা হুদ (১১:৭৮-৭৯) – জবরদস্তি ও বলাৎকারের সরাসরি চেষ্টা
সূরা আল-আনকাবুত (২৯:২৯) – রাহাজানি ও পথরোধ
সূরা আল-ক্বামার (৫৪:৩৭) – বলপ্রয়োগ ও চরম পরিণতি
সূরা আল-হিজর (১৫:৬৭-৭০) – দুর্বলদের ওপর ক্ষমতার অপব্যবহার।
কেউ যদি দাবি করে যে, "কওমে লুত নিরীহ ছিল, তারা শুধু নিজেদের মধ্যে সমপ্রেম করত এবং সে জন্যই আল্লাহ তাদের ধ্বংস করেছেন"—তবে সেটি হবে কোরআনের সম্পূর্ণ খণ্ডিত এবং ভুল পাঠ। কোরআনের এই আয়াতগুলো অকাট্য প্রমাণ যে, তাদের অপরাধের মূল অংশ জুড়েই ছিল পাশবিক জবরদস্তি এবং সামাজিক সন্ত্রাস।
বৌদ্ধ সহ অন্যান্য ধর্ম এবং প্রকৃত আধ্যাত্মিকতার নজরে
গ্রিক দেবতা অ্যাপোলো একজন মরণশীল পুরুষ হায়াসিন্থাসের প্রেমে পড়েছিলেন। এটি গ্রিক পুরাণের অন্যতম ট্র্যাজিক এবং সুন্দর একটি প্রেমের গল্প। প্রাচীন জাপানে সামুরাই যোদ্ধা এবং বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের মধ্যে পুরুষ-পুরুষ প্রেমের একটি সুদীর্ঘ এবং সম্মানিত প্রথা ছিল, যাকে 'নানশোকু' বলা হতো। এই সম্পর্কগুলোকে বীরত্ব, বিশ্বস্ততা এবং পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। অনেক প্রাচীন বৌদ্ধ উপাখ্যানেও এই সম্পর্কের উল্লেখ আছে, যেখানে এটিকে আধ্যাত্মিক পথের কোনো বাধা বলে মনে করা হয়নি।
এছাড়া আমরা যদি পৃথিবীর বেশিরভাগ স্থানীয় বা লোকজ বিশ্বাস বা অন্যান্য ধর্মগুলির দিকে খেয়াল করি, এবং গভীরভাবে বিশ্লেষণ করি সব ক্ষেত্রেই কিন্তু একটা বিষয় প্রমাণিত যে সকল ভালবাসার মানবিক সম্পর্কগুলিকে সম্মানের চোখে দেখা হয় এবং সঠিকভাবে উৎসাহ দেওয়া হয়। আধ্যাত্মিকতার পথে আত্মার মিলনকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কারণ সকল আত্মাই তো মূল পরমাত্মার অংশ।
কিছু অতিরিক্ত রক্ষণশীল মানসিকতা বা, কিছু মানুষের লালসাকেন্দ্রিক ঘৃণ্য প্রবৃত্তি যেমন শিশুকামিতা বা অনৈতিক যৌনাচার ,ধর্ষণ ,বলপূর্বক সম্পর্ক স্থাপন ইত্যাদি ভালোবাসার সংজ্ঞাকে অপব্যাখ্যা করে।
সমাজের মূল প্রবাহে শুধুমাত্র বংশরক্ষা এবং সৃষ্টিরধারাকে সঞ্চালনের জন্যই নারী এবং পুরুষের মিলনকে সর্বদা অনিবার্য করা হয়েছে। কিন্তু জীবন মানেই বৈচিত্র্য। বেশ কিছু মানুষ উদাহরণ দেয় এই সব ধরনের ভালোবাসা বা সম্পর্ক মানসিক ব্যাধি ; এর কোন ভবিষ্যৎ নেই।
ধরুন যদি কোন নারী এবং পুরুষ দম্পতি বন্ধ্যা হলো তাহলে কি সে ক্ষেত্রে তাদের সম্পর্ককেও সমাজ অস্বীকার করবে! ভালোবাসা কোন সন্তান উৎপাদনের মেশিন নয়। যেকোনো একটি সুস্থ সম্পর্কের জন্য দুটো মানুষের পারস্পরিক সম্মতি ভীষণ দরকার। একে অন্যের দোষগুলো খুঁজে তাকে অপমান বা ছোট না করে সে যেমন তাকে তেমনভাবে মানিয়ে নিয়ে তাকে শুধরাতে সাহায্য করা , খুনসুঁটি, পরস্পরকে সময় দেওয়া,একে অন্যের খুশিতে খুশি হওয়া ,উৎসাহ দেওয়া এবং একে অন্যের স্বাধীনতা খর্ব না করাটাই -প্রকৃত ভালোবাসা।
সেই নিরিখে তারা কি একই লিঙ্গ নাকি ভিন্ন লিঙ্গ সেটা বিচার করা কি আদৌ দরকার!একটা কথাই শেষে বলবো প্রকৃত ভালোবাসার জয় হোক; ভালো থাকুক ভালোবাসার বন্ধনে জড়ানো সকল মানুষগুলো।