ভারতীয় সিনেমা দীর্ঘদিন ধরে এই দেশের সমাজের প্রচলিত মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও পরিচয়কে প্রতিফলিত করে এসেছে। কিন্তু LGBTQ+ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব দীর্ঘ সময় ধরে ভারতীয় মূলধারার চলচ্চিত্রে উপেক্ষিত, বিকৃত অথবা হাস্যরসের উপাদান হিসেবে দেখানো হয়েছে। ভারতীয় চলচ্চিত্রে LGBTQ+ এর প্রতিনিধিত্ব কেবল একটি যৌনতা বা লিঙ্গ পরিচয়ের প্রশ্ন নয়; এটি ক্ষমতা, শ্রেণি, পিতৃতন্ত্র, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, সাংস্কৃতিক আধিপত্যের প্রশ্নের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় সমাজ এবং তার প্রতিফলন হিসেবে ভারতীয় সিনেমা একটি হেটেরোনরমেটিভ (heteronormative) কাঠামোকে সমর্থন করেছে যা একটি দক্ষিনপন্থী-ফ্যাসিস্ট রাজনৈতিক দলের তৈরি সমাজব্যবস্থা দ্বারা গঠিত। অর্থাৎ, নারী-পুরুষের বৈবাহিক সম্পর্ককেই “স্বাভাবিক” এবং “গ্রহণযোগ্য” হিসেবে দেখানো হয়েছে। এর বাইরে থাকা যৌনতা ও লিঙ্গ পরিচয়কে অস্বাভাবিক, বিকৃত বা হাস্যরসের বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
বামপন্থী সাংস্কৃতিক সমালোচকরা মনে করেন যে এই ধরনের উপস্থাপনা আসলে পিতৃতান্ত্রিক এবং শ্রেণিভিত্তিক সমাজব্যবস্থার সাংস্কৃতিক পুনরুৎপাদন। Antonio Gramsci-এর ভাষায়, শাসক শ্রেণি কেবল অর্থনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিক আধিপত্যের মাধ্যমেও নিজেদের ক্ষমতা বজায় রাখে। ভারতীয় সিনেমা বহু ক্ষেত্রে সেই সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বাহক হিসেবে কাজ করেছে।
১৯৭১ সালে “Badnam Basti” প্রথম ভারতে LGBTQ+ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব স্বরূপ চলচ্চিত্র – এরপর থেকে আজকের দিন অবধি যে যে চলচ্চিত্র বেরিয়েছে তার মধ্যে অদৃশ্যতা থেকে দৃশ্যমানতা, নীরবতা থেকে উচ্চারণের এবং দমন থেকে আত্মপ্রকাশের যাত্রা দেখায়।
ভারতীয় সিনেমায় LGBTQ+ বিষয়কে কেন্দ্র করে প্রথম যুগান্তকারী চলচ্চিত্র হিসেবে সাধারণত Fire-এর নাম উল্লেখ করা হয়। পরিচালক Deepa Mehta দুই গৃহবধূর মধ্যে প্রেমের সম্পর্ককে এমন এক সময়ে দেখিয়েছিলেন, যখন সমকামিতা নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনা প্রায় ছিল না।এই চলচ্চিত্রের দুই নারী চরিত্র—রাধা ও সীতা—শুধু সমকামী প্রেমের প্রতিনিধিত্ব করেন না; তাঁরা পিতৃতান্ত্রিক দাম্পত্য, ধর্মীয় রক্ষণশীলতা এবং নারীর ওপর আরোপিত সামাজিক নিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক। ছবিটি মুক্তির পর প্রবল বিতর্ক সৃষ্টি হয় যা সমাজের দক্ষিনপন্থী মনোভাবের স্বরূপ তুলে ধরে। ভারতীয় কুইয়ার চলচ্চিত্র ইতিহাসে এটি এক মাইলফলক যা সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদল করতে খানিক সাহায্য করে। “My Brother… Nikhil (2005)” ভারতীয় সিনেমায় প্রথম চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে একটি, যা একজন সমকামী ব্যক্তির জীবনকে সংবেদনশীল ও মানবিকভাবে তুলে ধরে। ছবিতে নিখিলের প্রেম, পরিবার এবং সামাজিক বঞ্চনার কাহিনি দেখানো হয়েছে।এই চলচ্চিত্র প্রমাণ করে যে LGBTQ+ মানুষ কেবল একটি “বিষয়” নন, বরং তাঁরা সমাজের পূর্ণাঙ্গ নাগরিক, যাঁদের আবেগ ও অধিকার সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
২০১০-এর দশক থেকে ভারতীয় সিনেমায় LGBTQ+ চরিত্রদের আরও জটিল, মানবিক ও বাস্তবধর্মীভাবে উপস্থাপন করা শুরু হয়।উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে রয়েছে— একজন সমকামী অধ্যাপকের জীবনের উপর ভিত্তি করে নির্মিত “Aligarh” সিনেমাটি একজন সমকামী অধ্যাপকের ব্যক্তিগত জীবনকে সমাজ ও রাষ্ট্র কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তা দেখানো হয়েছে। এখানে যৌন পরিচয়ের প্রশ্নটি নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকারের প্রশ্নে পরিণত হয়।
Michel Foucault দেখিয়েছেন যে আধুনিক রাষ্ট্র মানুষের শরীর ও যৌনতাকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ক্ষমতা প্রয়োগ করে। Aligarh-এর মতো চলচ্চিত্র সেই ক্ষমতা কাঠামোর সমালোচনা করে। যৌনতা, প্রতিবন্ধকতা এবং আত্মপরিচয়ের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে, পারিবারিক গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নকে জনপ্রিয় ধারার মাধ্যমে তুলে ধরে ও ট্রান্সজেন্ডার পরিচয়ের জটিলতা ও সামাজিক বৈষম্যকে গভীরভাবে উপস্থাপন করে “Margarita with a Straw”; “Shubh Mangal Zyada Saavdhan”; “Super Deluxe” এরম বহু সিনেমা তৈরি হয়। যা পুরাতন পিতৃতন্ত্রের বিরূদ্ধে নতুন উদারনৈতিক সমাজ গড়ে তুলতে সাহায্য করছে।
ভারতীয় ক্যুইয়ার চলচ্চিত্রচর্চায় ঋতুপর্ণ ঘোষ ছাড়া অসম্পূর্ণ। তাঁর চলচ্চিত্রে লিঙ্গ, যৌনতা ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন নতুন মাত্রা পায়।বিশেষভাবে “আরেকটি প্রেমের গল্প” এবং “চিত্রাঙ্গদা: দ্য ক্রাউনিং উইশ” (২০১২): এই ছবিতে জেন্ডার ফ্লুইডিটি বা লিঙ্গের তরলতা এবং নিজের শারীরিক পরিচয় বদলের লড়াই (লিঙ্গ পরিবর্তন) অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সাথে ফুটিয়ে তুলেছিলেন ঋতুপর্ণ নিজেই। বাংলা সিনেমায় LGBTQ+ প্রতিনিধিত্বের নতুন ভাষা নির্মাণ করে। চিত্রাঙ্গদা-তে লিঙ্গ পরিচয়কে স্থির নয়, বরং পরিবর্তনশীল ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখানো হয়েছে।ঋতুপর্ণ ঘোষ নিজেও জনপরিসরে এক গুরুত্বপূর্ণ ক্যুইয়ার কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, চলচ্চিত্রে ক্যুইয়ার চরিত্র উপস্থিত থাকলেও তাদের শ্রেণিগত অবস্থান মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত। শ্রমজীবী, দলিত, আদিবাসী বা দরিদ্র ক্যুইয়ার মানুষের অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে কম উঠে আসে। ফলে প্রতিনিধিত্বের মধ্যেও শ্রেণিগত বৈষম্য রয়ে যায়। কিন্তু শ্রমজীবী ক্যুইয়ার মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায় কৌশিক গাঙ্গুলী পরিচালিত “নগরকীর্তন” (Nagarkirtan – ২০১৭) ছবিটিতে। এটি ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে একটি মাস্টারপিস। ঋদ্ধি সেন (যিনি এই চরিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার পান) একজন রূপান্তরকামী নারী (পরিমল/পুঁটি) এবং ঋত্বিক চক্রবর্তী একজন সাধারণ চায়ের দোকানদারের চরিত্রে অভিনয় করেন। তাদের মধ্যকার এক অপার্থিব ও ট্রাজিক প্রেমের গল্প। ভারতের প্রথম রূপান্তরকামী কলেজের অধ্যক্ষ ড. মানবী বন্দ্যোপাধ্যায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন। তিনি ছবিতে নিজের আসল পরিচয়েই (অধ্যক্ষ হিসেবে) উপস্থিত হন এবং প্রধান চরিত্র পরিমলের ট্র্যাজিক সংকটের সময়ে তাকে আশ্রয় ও মানসিক সাহস জোগান। এটি বাংলা ক্যুইয়ার চলচ্চিত্রে বাস্তব জীবনের একজন থার্ড জেন্ডার মানুষের অসাধারণ আত্মপ্রকাশ।
সুবেন্দু ঘোষ পরিচালিত ‘কপাল’ সিনেমাটি প্রান্তিক মানুষের আত্মমর্যাদা এবং শ্রেণী-সংগ্রামের এক মানবিক দলিল। ছবির মূল চরিত্র কানাই মাঝি একজন সর্বহারা শ্রমজীবী ও মেহনতি টোটো চালকের প্রতিনিধি। রাতারাতি লটারি জেতার পর কীভাবে পুঁজিবাদী সমাজ তাকে গ্রাস করতে আসে, তা ছবিতে স্পষ্ট ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। দুর্নীতিবাজ রাজনীতিক ও দালালদের লোভী আচরণ বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থার শোষক রূপকে তুলে ধরে। ছবিটিতে দেখানো হয়েছে যে, অতিরিক্ত টাকা মানুষের সহজ সুখ কেড়ে নেয়। কানাই মাঝিকে কোনো কৃত্রিম হিরো না দেখিয়ে, এক রক্তমাংসের অসহায় কিন্তু সৎ মানুষ হিসেবে মানবিকীকরণ করা হয়েছে। সমাজের চোখে ব্রাত্য ও প্রান্তিক হিজড়া/রূপান্তরকামী সম্প্রদায়কে এই ছবির সাথে বিশেষভাবে যুক্ত করা হয়েছে।ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের বাস্তব লড়াইয়ের সাথে মেহনতি মানুষের জীবনের এক মানবিক মেলবন্ধন ঘটেছে এই চলচ্চিত্রে।পুঁজিবাদী লোভের কাছে মাথা নত না করে, শেষ পর্যন্ত মানুষের আদিম সততা ও যৌথতার চেতনাই জয়ী হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে সিজনস গ্রিটিংস (২০২০): রামকমল মুখোপাধ্যায়ের এই ছবিতে ট্রান্সজেন্ডার অভিনেতা ‘শ্রী’-কে মুখ্য একটি চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।এই ছবির মাধ্যমে তিনি নিজেকে বলিউডের অন্যতম প্রথম মেইনস্ট্রিম ট্রান্সজেন্ডার অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। সাম্প্রতিক সময়ের আরো একটি ছবি আমি সায়রা বানো (২০১৬): এই ছবিতে অভিনেতা রাজকুমার রাও একজন রূপান্তরকামীর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। যদিও ধ্রুপদী মার্কসবাদ সরাসরি LGBTQ+ প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করেনি, সমকালীন মার্কসবাদী চিন্তাবিদরা মনে করেন যে যৌন নিপীড়ন ও শ্রেণি নিপীড়ন পরস্পর সম্পর্কযুক্ত।Judith Butler দেখিয়েছেন যে লিঙ্গ একটি সামাজিক নির্মাণ। অন্যদিকে মার্কসবাদ দেখায় যে সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষমতা ও আধিপত্যের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। ফলে কুইয়ার মুক্তি এবং শ্রেণি মুক্তি—দুটিকেই বৃহত্তর মানবমুক্তির প্রকল্পের অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। আজকের ভারতীয় সিনেমা Fire–এর সময়ের তুলনায় অনেক দূর এগিয়েছে। আগে যেখানে LGBTQ+ চরিত্ররা ছিল উপহাসের বিষয়, এখন তারা কাহিনির কেন্দ্রবিন্দু। আগে যেখানে ক্যুইয়ার প্রেম ছিল নিষিদ্ধ বিষয়, এখন তা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি রাজনৈতিক ও মানবিক আলোচনার অংশ।তবে এখনও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। অধিকাংশ চলচ্চিত্রে মধ্যবিত্ত শহুরে LGBTQ+ জীবনের প্রতিনিধিত্ব দেখা যায়; দলিত, আদিবাসী, শ্রমজীবী এবং গ্রামীণ ক্যুইয়ার মানুষের অভিজ্ঞতা এখনও তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমান। এই দেশের ইন্ডাস্ট্রি প্রান্তিক লিঙ্গের মানুষদের নিয়ে বিক্ষিপ্তভাবে কিছু চলচ্চিত্র তৈরি করলেও, আসলে এই প্রান্তিক লিঙ্গের মানুষদের ভারতীয় চলচ্চিত্রে সক্রিয় অংশগ্রহণ এখনও পর্যন্ত সম্ভবপর করে তুলতে পারেনি। এই দেশের ইন্ডাস্ট্রির উচিত ভারতীয় চলচ্চিত্রে প্রান্তিক লিঙ্গের মানুষের অংশগ্রহন বাড়ানো এবং এই প্রান্তিক লিঙ্গের মানুষদের ভারতীয় চলচ্চিত্রের মূলস্রোতে নিয়ে আসা।
ভারতীয় সিনেমায় LGBTQ+ প্রতিনিধিত্বের ইতিহাস আসলে মানুষের স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকারের ইতিহাস। Fire থেকে Badhaai Do, Chitrangada থেকে Aligarh—এই যাত্রা দেখায় কীভাবে প্রান্তিক কণ্ঠস্বর ধীরে ধীরে মূলধারার পর্দায় নিজের জায়গা করে নিয়েছে। বামপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের শেখায় যে মুক্তি কেবল অর্থনৈতিক নয়; ভালোবাসা, পরিচয় এবং নিজের অস্তিত্বকে স্বীকার করানোর অধিকারও মুক্তিরই অংশ। তাই LGBTQ+ মানুষের সংগ্রাম কোনো বিচ্ছিন্ন সংগ্রাম নয়, বরং সকল প্রকার বৈষম্য, নিপীড়ন ও পিতৃতান্ত্রিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে বৃহত্তর মানবমুক্তির আন্দোলনেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ভারতীয় সিনেমা যখন এই কণ্ঠস্বরগুলোকে আরও সংবেদনশীল ও মর্যাদার সঙ্গে তুলে ধরবে, তখনই তা সত্যিকার অর্থে বহুত্ববাদী, গণতান্ত্রিক এবং মানবিক সংস্কৃতির প্রতিফলন হয়ে উঠবে।