নিশান

রামধনুর আড়ালে লুকিয়ে থাকা গল্পগুলো: বাংলা সাহিত্যে Queer পরিচয়ের সন্ধান

শ্রীজীতা ব্যানার্জী

ভাবুন তো, বাংলা সাহিত্যে আপনার কোনো চিরপরিচিত চরিত্র হঠাৎ কোনো অলৌকিক শক্তির জোরে প্রাণ পেয়েই বলে উঠলেন—" ধুর মশাই!! আমার গল্পটা আপনারা ঠিকমতো শোনেন’ইনি।" আপনি অবাক হবেন না কী? আসলে সাহিত্যের পাতায় বহুদিন ধরেই এমন অনেক চরিত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে, যাদের অনুভূতি, আকাঙ্ক্ষা কিংবা পরিচয়কে আমরা সেই এক প্রচলিত চোখে দেখে এসেছি। অথচ তাদের গল্পের ভেতরে লুকিয়ে ছিল অন্য এক জগৎ—Queer অভিজ্ঞতার জগৎ।

বাংলা সাহিত্যে Queer নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমেই চলে যেতে হয় রামায়ণ মহাভারতে। মানছি তা সংস্কৃত ভাষায় লেখা তবুও রামায়ণ মহাভারত বাংলার “ঘরের লোকের” মতোই, আর অনুবাদিত রামায়ণ মহাভারত বাংলায় বহুযুগ ধরেই পড়া হয়ে আসছে,তাই তাকে বাংলা সাহিত্যে ধরতে খুব একটা সংকোচ বোধ হয় না। তাতেও কিছু দ্বন্দ্ব যদি থেকে যায় তাহলে বলি,রামায়ণ মহাভারত বাংলায় অনুবাদিত হয় সেই পঞ্চদশ শতকে। প্রায় ৬০০ বছরেরও ওপরে যে লেখা বাংলা ভাষায় পড়া হচ্ছে তাকে বাংলা সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত না করে উপায় কি।

রামায়ণে আমরা যতোই রামের পৌরুষ সীতার সতীত্ব হনুমানের প্রভূভক্তি মনে রেখেছি তার অতলে আরেকটু তলিয়ে দেখলে আমরা হয়তো বুঝতে পারতাম রাজা ভগীরথের জন্মের সাথে গভীর ভাবে লুকিয়ে আছে LGBTQA+ সমাজের যোগসূত্র। কৃত্তিবাসী রামায়ণ অনুযায়ী, অযোধ্যার রাজা দিলীপ নিঃসন্তান অবস্থায় মারা গেলে বংশরক্ষার জন্য দেবতাদের আশীর্বাদে তাঁর দুই বিধবা রানী পরস্পরের সঙ্গে শারীরিক মিলনে লিপ্ত হন। এই মিলনের ফলেই জন্ম হয় কোকিলকণ্ঠী রাজা ভগীরথের। এই ঘটনাই শুধু নয়, বাল্মীকি রামায়ণে রয়েছে রাজা ইলার কাহিনী যা তৎকালীন সমাজে Queer’দের সামাজিক অবস্থানের প্রতিফলন তুলে ধরে। বৈবশ্বত মনু ও তার স্ত্রী শ্রদ্ধার পুত্রকাম যজ্ঞের ফলে প্রথমে কন্যা 'ইলা' জন্ম নেন। পরে গুরু বশিষ্ঠদেবের প্রার্থনায় ভগবান শিব ইলাকে সুদ্যুম্ন নামক এক পরাক্রমশালী পুরুষে রূপান্তরিত করেন। পরবর্তীকালে শিবকে রুষ্ট করায় শিবের অভিশাপে রাজা সুদ্যুম্ন পুনরায় নারী ইলা হয়ে যান। এবং পরবর্তীতে পার্বতীর আশীর্বাদে তিনি একমাস নারী এবং একমাস পুরুষের রূপ ধরে থাকার বরদান পান। নারী রূপে তিনি বুধ দেবতাকে বিবাহ পর্যন্ত করেন এবং সন্তানের জন্ম দেন। এছাড়াও তুলসীদাসের রামচরিতমানস কাব্যে শ্রীরামচন্দ্র বলেছেন যে—পুরুষ, নারী বা 'নপুংসক', যে কেউই ভক্তিভরে তাঁর কাছে এলে তিনি তাকে সমানভাবে ভালোবাসেন। তাহলেই বুঝুন, LGBTQA+ সমাজ আমাদের সংস্কৃতির কতো প্রাচীন অংশ। অভিশাপের ফলে বা বরদানের ফলে লিঙ্গ পরিবর্তন!! এটা কি আসলে তৎকালীন সমাজে প্রান্তিক লিঙ্গের মানুষের প্রতি তৎকালীন সমাজের দৃষ্টিকোণ স্পষ্ট করে তোলে না? রাজা ইলার লিঙ্গ পরিবর্তন বা রাজা ভগীরথের দুই মা থাকায় কিন্তু কেউ কোন প্রশ্ন তোলেনি বরং অতি সহজেই তা মেনে নিয়ে এসেছে বাংলার সমাজ। এর থেকেই কি বোঝা যায় না যে বাংলার সমাজে, সংস্কৃতিতে এবং মননে লিঙ্গ পরিবর্তন বা সমকামীতা এগুলো আর সকল বিষয়ের মতোই স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক। এবার আসি মহাভারতে। মহাভারত নিয়ে বললেই প্রথমেই মাথায় আসে শিখণ্ডীর কথা। কাশিরাজের জ্যেষ্ঠ কন্যা অম্বা ভীষ্মের প্রতি ক্ষোভে পরজন্মে মেয়ে হয়ে জন্মালেও ছেলের মতোই বড়ো হতে থাকে এবং যুদ্ধবিদ্যা অশ্বারোহণ সবই শেখে। পরবর্তীকালে স্থূণাকর্ণ নামের এক যক্ষ নিজের পুরুষত্ব শিখণ্ডীর নারীত্বের সাথে অদলবদল করেন। এর ফলে শিখণ্ডী পূর্ণাঙ্গ পুরুষ যোদ্ধায় পরিণত হন। ভাবুন তো একবার, মহাভারতে রয়েছে এক রূপান্তরকামী মহিলার কথা যে কিনা সফল ভাবে রূপান্তরিত হয়েছিলো!! অবাক লাগছে না? অবাক লাগা এখনও একটু বাকি আছে। বারো বছরের বনবাস কাটিয়ে এক বছরের অজ্ঞাতবাসের সময় বীরশ্রেষ্ঠ অর্জুন যে কিনা পৌরুষের অন্যতম উদাহরণ, নিজের পরিচয় লুকিয়ে রাখার জন্য 'বৃহন্নলা' নাম ধারণ করে। সে তৃতীয় লিঙ্গের (ক্লীব) রূপ নিয়ে বিরাট রাজার প্রাসাদে ছিলো এক বছর। সেখানে কিন্তু অর্জুন রাজকুমারী উত্তরার নাচ এবং গানের শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত ছিলো। এই রূপান্তর অর্জুনের চিরপরিচিত পুরুষালি যোদ্ধা ভাবমূর্তির বাইরে গিয়ে এক ভিন্ন ধরনের রূপ তুলে ধরেনি কী? ওদিকে আবার ইক্ষ্বাকু বংশের রাজা যুবনাশ্ব মন্ত্রপূত জল যা তার স্ত্রী দের গর্ভধারণের জন্য ছিলো ভুলবশত পান করার ফলে, একজন পুরুষ হওয়া সত্ত্বেও তিনি গর্ভবতী হন এবং তার কোমর বা পার্শ্বদেশ কেটে মান্ধাতা নামের এক পুত্রের জন্ম হয়। অন্যদিকে শ্রীকৃষ্ণের মোহিনী রূপ ধারণ করে অর্জুন পুত্র ইরাবানকে বিবাহ তারপর রাজা ভঙ্গস্বনের ইন্দ্রের অভিশাপে পুরুষ থেকে নারীতে রূপান্তর এবং শেষ পর্যন্ত নারী হয়েই থাকতে চাওয়া, পুরানে যে বারবার উঠে এসেছে প্রান্তিক লিঙ্গের মানুষের কথা এবং সেখানে আর সকল মানুষের সাথে প্রান্তিক লিঙ্গের মানুষদেরও একই আসনে বসানো হয়েছে সেই কথা অস্বীকার করা যায় কী? না যায় না, কারণ পুরান সাহিত্যের বারবার উঠে এসেছে সমাজের প্রান্তিক লিঙ্গের মানুষের কথা।

পুরান তো গেলো এবার আস্তে আস্তে সময়ের গতি ধরে সামনের দিকে এগোলে প্রথমেই চোখে পড়ে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের “মায়ামৃদঙ্গ”। এখানে উপন্যাসের প্রধান চরিত্র আলিবর্দি ও তার তরুণ সঙ্গী ধনঞ্জয়ের সম্পর্কটি কেবল অভিনয়ের মঞ্চে সীমাবদ্ধ থাকে না। পোশাক ও অভিনয়ের জেন্ডার ফ্লুইডিটি (Gender Fluidity) তাদের বাস্তব জীবনেও মানসিক ও শারীরিক আকর্ষণে রূপ নেয়। সিরাজ দেখিয়েছেন কীভাবে গ্রামীণ সংস্কৃতির ভেতরেই এক ধরনের অবদমিত সমকামিতা ও লিঙ্গ রূপান্তর লুকিয়ে আছে।

অন্যদিকে কবিতা সিংহের “পৌরুষ” উপন্যাসটি আশির দশকে দাঁড়িয়ে জেন্ডার রাজনীতির এক সাহসী দলিল। এখানে মূল চরিত্রদের মনস্তাত্ত্বিক টান এবং আচরণের মধ্য দিয়ে দেখানো হয়েছে যে, সমাজ-নির্ধারিত ‘পুরুষত্ব’ বা ‘নারিত্ব’ আসলে এক ধরনের আরোপিত ধারণা। উপন্যাসে নারীর ভেতর পুরুষালী ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা এবং পুরুষের সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ ও কোমলতার যে দ্বন্দ্ব, তা তথাকথিত বিষমকামী (heterosexual) সমাজের বাঁধাধরা নিয়মকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। আবার আমরা দেখতে পাই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা সেই সময় যা একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রচিত এক বিখ্যাত উপন্যাস। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রখ্যাত কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত এবং গৌরদাস বসাকের সম্পর্ককে সমকামী আঙ্গিকে আলোড়িত করে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন, যা বাংলা সাহিত্যে পুরুষালি বন্ধুত্বের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সমকামিতাকে ইঙ্গিত করে। অন্যদিকে আবার প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক আবুল বাশার তার নরম হৃদয়ের চিহ্ন উপন্যাসে বিষমকামিতার বৃত্ত ভেঙে সমকাম, উভকাম ও রূপান্তরকামিতার মনস্তাত্ত্বিক স্তরগুলো অত্যন্ত নিপুণভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।

এছাড়াও কমল চক্রবর্তীর ‘ব্রহ্মভার্গব পুরাণ’, কৃষ্ণগোপাল মল্লিকের ‘এন্টারিং দ্য মেজ’, স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ‘হলদে গোলাপ’, মৌলি আজাদের “রক্তজবাদের কেউ ভালোবাসেনি”, নমিতা দাশের “মেয়েজন্ম”, নবনীতা দেবসেনের কিছু কবিতা এবং সর্বোপরি ভারতের প্রথম রূপান্তরকামী কলেজ অধ্যক্ষ ড. মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বাংলা সমাজ ও সাহিত্যে তৃতীয়সত্তা চিহ্ন’ বইগুলি এক অনন্য তাত্ত্বিক ও সামাজিক দলিল। বাংলার সমাজে প্রান্তিক লিঙ্গের মানুষদের প্রতি প্রচুর ছুঁৎমার্গ যেমন লক্ষ্য করা যায় তেমনই বাংলা সাহিত্যে প্রান্তিক লিঙ্গের মানুষদের জন্য এবং প্রান্তিক লিঙ্গের মানুষদের নিয়ে এতো সাহিত্যিক উদাহরণ আছে যে তা অনায়াসেই এই সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা সকল “Queer ছুঁৎমার্গ” এর ওপর এক প্রবল চপেটাঘাত হয়ে পড়তেই পারে।

পরিশেষে, বাংলা সাহিত্যে Queer থিম কোনো সাময়িক প্রবণতা নয়; এটি সাহিত্যের মানবিক বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদা থেকে শুরু করে সমকালীন Queer গল্প—সবকিছুই আমাদের শেখায় যে মানুষের জীবন আসলেই বহুরঙা। হয়তো সেই কারণেই বাংলা সাহিত্যের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে রামধনুর অদৃশ্য ছাপ। শুধু দরকার একটু অন্যরকম চোখে তাকানোর। তখনই দেখা যাবে—এই গল্পগুলো আসলে আমাদের সবার গল্প।