কলকাতার বুকে তখন শ্রাবণের অঝোর বারিধারা নামিয়াছে। বাগবাজারের এই পৈতৃক বাড়িটির বয়স দেড় শতাব্দীর কম নয়। কড়িকাঠের ছাদ, চওড়া রোয়াক আর স্যাঁতসেঁতে দেওয়ালের পরতে পরতে যেন কালের কত না-বলা ইতিহাস ঘুমাইয়া আছে। দোতলার কোণের ঘরটিতে একটি তেলের বাতি (এখন অবশ্য হারিকেনের বদলে টেবিল ল্যাম্প) জ্বালিয়া বসিয়া ছিল শৌনক। পেশায় সে একজন স্বাধীন গবেষক, নেশায় ইতিহাসের ধুলোমাখা পাতা ঘাঁটিয়া বিস্মৃত সত্যের অন্বেষণকারী।
সেদিন বিকেলে চিলেকোঠার পুরনো সিন্দুকটি পরিষ্কার করিতে গিয়া তাহার হাতে ঠেকিয়াছিল একখানা ভারী, চামড়ায়-বাঁধানো খাতা। পাতাগুলি হলদেটে, ভঙ্গুর। প্রথম পাতায় বিবর্ণ কালিতে লেখা— 'শ্রী উমাপ্রসাদ মল্লিক, সাল ১৮৮৫'। উমাপ্রসাদ ছিলেন শৌনকের প্রপিতামহ। ঊনবিংশ শতাব্দীর এক সুশিক্ষিত, অভিজাত বাঙালি, যিনি নিজের মনেই সন্তর্পণে লালন করিয়াছিলেন এমন এক সত্য, যাহা তৎকালীন সমাজের চোখে ছিল 'প্রকৃতিবিরুদ্ধ' এবং চরম অপরাধ।
উমাপ্রসাদের সেই ডায়েরি এবং শৌনকের বর্তমান গবেষণার নোট— এই দুইয়ের অদ্ভুত এক কাল্পনিক কথোপকথন ঘিরিয়াই আজন্মকালের এক নিষিদ্ধ ইতিহাসের পর্দা উন্মোচিত হইতে শুরু করিল।
১. আদি যুগের পদাবলি: ভগীরথের জন্ম ও সখীভাব
ডায়েরির পাতা উল্টাইতেই শৌনক দেখিল, উমাপ্রসাদ কেবল নিজের কথাই লেখেন নাই, তিনি রীতিমতো গবেষণা করিয়াছিলেন বাংলার প্রাচীন সাহিত্যে এই 'অপ্রচলিত' প্রেমের অস্তিত্ব খুঁজিয়া বাহির করিতে।
উমাপ্রসাদ ডায়েরির এক জায়গায় গভীর আক্ষেপের সহিত লিখিয়াছেন—
"আজ যাঁহারা সাহেবদের প্রণীত আইনে আমাদের পাপী বলিয়া দাগিয়া দিতেছেন, তাঁহারা কি নিজেদের শেকড়ের কথা বিস্মৃত হইয়াছেন? কৃত্তিবাস ওঝার 'শ্রীরামপাঁচালী' বা রামায়ণ আমি তন্নতন্ন করিয়া খুঁজিয়াছি। সেখানে রাজা ভগীরথের জন্মের যে উপাখ্যান রহিয়াছে, তাহা কি সাধারণ? রাজা দিলীপ অপুত্রক অবস্থায় মারা গেলেন। দেবতারা চিন্তিত। তখন দেবাদিদেব মহাদেব আশীর্বাদ করিলেন, রাজার দুই বিধবা রানির শারীরিক মিলনের ফলেই জন্ম নিবে এক পুত্রসন্তান। এই যে দুই নারীর মধ্যে লৈঙ্গিক ও শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমে এক নতুন প্রাণের জন্ম— ইহা কি নারী-নারী সম্পর্কের (Lesbianism) এক আদিম ও আধ্যাত্মিক স্বীকৃতি নয়?"
শৌনক ডায়েরি হইতে চোখ তুলিয়া ভাবিল, শরদিন্দুর ব্যোমকেশ যেমন প্রমাণের সূত্র ধরে গভীরে যায়, উমাপ্রসাদও তেমনই নিজের অস্তিত্বের সপক্ষে যুক্তি খুঁজিতেছিলেন। তিনি আরও লিখিয়াছেন বৈষ্ণব ধর্মের 'সখীভাব' বা 'গোপীভাব'-এর কথা।
"পুরুষ শরীর লইয়া জন্মাইলেও শ্রীকৃষ্ণের আরাধনায় অনেক বৈষ্ণব সাধক নিজেদের মানসিকভাবে রাধার সখী কল্পনা করেন। তাঁহাদের বেশভূষা, কথা বলার ধরন— সবই নারীর মতো হইয়া যায়। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান যাহাকে লৈঙ্গিক তারল্য বা 'জেন্ডার ফ্লুইডিটি' বলিয়া আখ্যা দেয়, আমাদের আধ্যাত্মিক সাধনায় তো তাহা বহু প্রাচীনকাল হইতেই স্বীকৃত। তবে আজ কেন এই সামাজিক শৃঙ্খল?"
২. ভিক্টোরীয় খাঁড়া এবং বাবুসমাজের দ্বিচারিতা
উমাপ্রসাদের লেখায় এরপর নামিয়া আসিয়াছে এক অদ্ভুত বিষাদ ও ক্ষোভের ছায়া। সময়টা ব্রিটিশ ভারতের। ১৮৬১ সাল। ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় দণ্ডবিধিতে জুড়িয়া দিয়াছে কুখ্যাত ৩৭৭ ধারা (Section 377)।
"আইনের চোখে আজ আমরা অপরাধী। যে প্রেম কেবল আত্মার ডাক শোনে, তাহাকে ব্রিটিশের আইন 'প্রকৃতিবিরুদ্ধ' বলিয়া শূলে চড়াইয়াছে। ব্রাহ্ম সমাজ আর নব্য হিন্দু সমাজের নেতারা এখন ভিক্টোরীয় নৈতিকতার ধ্বজাধারী। তাঁহাদের চোখে যৌনতা কেবল বংশবৃদ্ধির যান্ত্রিক উপায়মাত্র। কিন্তু এই বাবুদের আসল রূপটি আমি চিনি। দিনের বেলায় যাঁহারা শুদ্ধাচারী সাজেন, রাতের অন্ধকারে তাঁহাদের ঘোড়ার গাড়ি ঠিক গিয়া থামে বেলগাছিয়া বা বাগমারির গোপন বাগানবাড়িতে। সেখানে অল্পবয়সী, রূপবান 'ছোকরা'দের দিয়া নারীবেশে বিনোদনের ব্যবস্থা হয়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁহার উপন্যাসে যেমন বাবুসমাজের এই গোপন পুরুষ পতিতালয় ও সমকামী চর্চার খণ্ডচিত্র আঁকিয়াছেন, আমি তো তাহা নিজের চোখেই এই উনিশ শতকের কলকাতায় দেখিতেছি। কী ভয়ানক এই দ্বিচারিতা! সমাজের নিচুতলার মানুষদের ব্যবহার করিয়া বাবুরা নিজেদের প্রচ্ছন্ন কামনা মেটায়, অথচ প্রকাশ্যে সমকামিতাকে ঘোরতর পাপ বলিয়া ফতোয়া দেয়।"
৩. গ্যাসবাতির আলোয় লৈঙ্গিক রূপান্তর: থিয়েটার ও আলকাপ
ডায়েরির পাতা উল্টাইতে উল্টাইতে শৌনক যেন এক শতাব্দী পিছাইয়া গেল। উমাপ্রসাদ প্রেমে পড়িয়াছিলেন থিয়েটারের এক অভিনেতার। নাম বিমল। তৎকালীন সমাজে নারীদের থিয়েটারে অভিনয় করা নিষিদ্ধ ছিল। তাই পুরুষরাই শাড়ি পরিয়া, নকল চুল লাগাইয়া মঞ্চে উঠিত।
উমাপ্রসাদের কলমে বিমলের বর্ণনা যেন এক মায়াবী উপাখ্যান:
"মঞ্চের গ্যাসবাতির আলো যখন বিমলের মুখে আসিয়া পড়ে, সে আর বিমল থাকে না, সে হইয়া ওঠে 'প্রমীলা' বা 'কাদম্বিনী'। তাহার চোখের দৃষ্টিতে, তাহার হাতের মুদ্রায় এক অদ্ভুত নারীসত্তার জাগরণ ঘটে। গ্রিনরুমে যখন সে ক্লান্ত হইয়া আমার কাঁধে মাথা রাখে, আমি বুঝিতে পারি না আমি এক পুরুষকে ভালোবাসিতেছি, নাকি এক নারীসত্তাকে। এই লৈঙ্গিক পারফরম্যান্স কেবল অভিনয় নয়, ইহা এক মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর। পরবর্তী যুগে চপল ভাদুড়ী (যিনি চপল রানী নামে পরিচিত হইবেন) যেমন পুরুষ হইয়াও আজীবন নারীসত্তার যন্ত্রণায় দগ্ধ হইবেন, আমার বিমলও তেমনই সমাজ ও নিজের আত্মপরিচয়ের মাঝে এক ছিন্নভিন্ন চরিত্র।"
উমাপ্রসাদ একবার জমিদারি তদারকির কাজে মুর্শিদাবাদ গিয়াছিলেন। সেখানে তিনি গ্রামীণ বাংলার এক অন্য রূপ দেখেন। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের 'মায়ামৃদঙ্গ' উপন্যাসে যেমন বর্ণিত আছে, উমাপ্রসাদ অবিকল সেই দৃশ্য বর্ণনা করিয়াছেন:
"মালদহ ও মুর্শিদাবাদের প্রত্যন্ত গ্রামে 'আলকাপ' লোকনাট্যের আসর বসে। সেখানে কিশোর ছেলেরা নারী সেজে নাচে, তাহাদের বলা হয় 'ছোকরা'। আমি অবাক হইয়া দেখিলাম, হারিকেনের আলোয় যখন সেই ছোকরারা কোমর দুলাইয়া নাচে, তখন গ্রামীণ পুরুষ দর্শকদের চোখে এক সুপ্ত, অপ্রকাশ্য যৌন আকর্ষণ (Homoeroticism) ঝকঝক করে। গ্রামীণ সমাজ এই সত্যকে লোকসংস্কৃতির মোড়কে বাঁধিয়া রাখিয়াছে। সেখানে কলকাতার বাবুদের মতো ভণ্ডামি নাই, আছে এক আদিম, পাশবিক অথচ সৎ কামনার প্রকাশ।"
৪. রবিরশ্মিতে লিঙ্গ-তারল্য এবং কল্লোলের অবদমিত মনস্তত্ত্ব
শৌনক মুগ্ধ হইয়া পড়িতেছিল। উমাপ্রসাদ রবীন্দ্রনাথের যুগের মানুষ। প্রকাশ্যে সমকামিতা নিয়ে আলোচনা করা তখন অসম্ভব। কিন্তু সাহিত্য কি আর থেমে থাকে? সে অন্য পথ খুঁজিয়া লয়।
"রবিবাবুর 'চিত্রাঙ্গদা' আমি বহুবার পড়িয়াছি,"উমাপ্রসাদ লিখিয়াছেন। "মণিপুরের রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদাকে রাজপুত্রের মতো, পুরুষের পোশাকে ও যুদ্ধবিদ্যায় বড় করা হইয়াছিল। সে মনে-প্রাণে পুরুষই ছিল। কিন্তু অর্জুনকে দেখার পর তাহার নারীসত্তার জাগরণ ঘটে। এই যে জেন্ডার বা লিঙ্গ পরিচয় জন্মগত নয়, বরং সামাজিকভাবে নির্মিত এবং পরিবর্তনশীল— রবিবাবু কী সুনিপুণ মনস্তত্ত্বের মধ্য দিয়া তাহা ফুটাইয়া তুলিয়াছেন! আবার তাঁহার 'চোখের বালি' বা 'যোগাযোগ' উপন্যাসে নারীদের মধ্যে যে গভীর সখ্য (Homosocial bonds) দেখা যায়, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে অবহেলিত নারীদের একে অপরের প্রতি সেই তীব্র আবেগময় নির্ভরশীলতা কি কুইয়ার দর্শনেরই এক প্রচ্ছন্ন রূপ নয়?”
বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের দিকে যখন ডায়েরি এগোচ্ছে, তখন 'কল্লোল' যুগের হাওয়া। উমাপ্রসাদ তখন প্রৌঢ়। তিনি পড়িতেছেন জগদীশ গুপ্ত এবং শিবরাম চক্রবর্তী।
"শিবরামের আত্মজীবনী 'ছেলে বয়সে' পড়িলাম। কিশোর বয়সের সমকামী আকর্ষণের এমন প্রচ্ছন্ন অথচ সৎ উল্লেখ এর আগে বাংলা সাহিত্যে দেখি নাই। জগদীশ গুপ্তের গল্পগুলোতে মানুষের মনের অন্ধকার, অবদমিত যৌনতা আর ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বের যে খেলা চলিতেছে, তাহাতে আমার বিশ্বাস হয়, একদিন এই সমাজ বদলাইবে। একদিন এই বদ্ধ কুঠুরি ভাঙিয়া আলো আসিবে।"
৫. অন্ধকার পেরিয়ে আলো: আধুনিক সাহিত্যের ক্যানভাস
উমাপ্রসাদের ডায়েরিটি ১৯৩০ সালের দিকে হঠাৎ শেষ হইয়া যায়। হয়তো বিমল তাহাকে ছাড়িয়া গিয়াছিল, অথবা সমাজের চাপে উমাপ্রসাদ বাধ্য হইয়াছিলেন এক সাধারণ বিবাহিত জীবন মানিয়া লইতে। কিন্তু তাঁহার শেষ লাইনের ভবিষ্যৎবাণী আজ অক্ষরে অক্ষরে মিলিয়া গিয়াছে।
শৌনক ডায়েরিটি বন্ধ করিল। তাহার টেবিলের ওপর এখন ছড়ানো আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অগুনতি বই। শৌনক নিজের গবেষণাপত্রে উমাপ্রসাদের ডায়েরির সূত্র ধরিয়া বর্তমান যুগের ইতিহাস লিখিতে শুরু করিল।
সে লিখিল:
"উমাপ্রসাদ যে মুক্তির স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন, একুশ শতকের বাংলা সাহিত্য সেই মুক্তির পতাকা সগর্বে বহন করিতেছে। আজ আর কুইয়ার (Queer) বা সমকামী থিম রূপকের আড়ালে লুকিয়ে নেই। স্বপ্নময় চক্রবর্তীর সাহিত্য অকাদেমি প্রাপ্ত উপন্যাস 'হলদে গোলাপ'-এর কথা ধরুন। এটি কেবল একটি উপন্যাস নয়, এটি ট্রান্সজেন্ডার ও সমকামী জীবনের এক বিশ্বকোষ। এই উপন্যাসে হিঁজড়ে সম্প্রদায়ের নিজস্ব ফার্সি-মিশ্রিত গুপ্ত ভাষার কথা আছে, আছে ৩৭৭ ধারার ভয় দেখিয়ে সমকামী পুরুষদের ব্ল্যাকমেল করার বাস্তব চিত্র। সমকামিতাকে 'মানসিক রোগ' হিসেবে দাগিয়ে দেওয়ার যে ডাক্তারি ভ্রান্তি, স্বপ্নময়বাবু তাকে বৈজ্ঞানিক যুক্তিতে খণ্ডন করেছেন।
আবার নারী-নারী প্রেমের ক্ষেত্রে তিলোত্তমা মজুমদারের 'চাঁদের গায়ে চাঁদ' এক যুগান্তকারী সৃষ্টি। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে যেখানে নারীর শরীর কেবল পুরুষের ভোগদখলের বস্তু, সেখানে দুজন নারীর পারস্পরিক প্রেম ও শারীরিক আকর্ষণ কীভাবে পুরুষতন্ত্রের ভিত কাঁপিয়ে দেয়, তা এই উপন্যাসে স্পষ্ট। নবনীতা দেবসেনের 'বামাবোধিনী' বা 'অভিজ্ঞান'-এও এই মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে উঠে এসেছে। আধুনিক ছোটগল্পকার মন্দাক্রান্তা সেনের 'কলকব্জা' নামক গল্পগ্রন্থে সমকামী সম্পর্ক আজ সমাজের সমস্ত প্রচলিত নিয়ম ভাঙার সাহস রাখে।
আর এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় কারিগরদের অন্যতম হলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা এবং 'ফার্স্ট পার্সন' কলামের মাধ্যমে তিনি বাঙালি মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুমে তৃতীয় লিঙ্গ ও সমকামী পরিচিতির আলোচনাকে একটি সাবলীল ও সম্মানজনক স্থান দিয়েছেন। তাঁর নিজের জীবনের লৈঙ্গিক তারল্য ও পোশাকের স্বাধীনতা এক নীরব অথচ শক্তিশালী বিপ্লব ছিল। অন্যদিকে, মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়— ভারতের প্রথম রূপান্তরকামী কলেজ অধ্যক্ষা— তাঁর আত্মজীবনীতে পুরুষ শরীরে জন্ম নেওয়া এক নারীর মন কীভাবে সমাজ ও চিকিৎসা ব্যবস্থার গঞ্জনা পেরিয়ে নিজের অধিকার ছিনিয়ে নেয়, তার জীবন্ত দলিল রেখে গেছেন।মূলধারার বাইরে 'প্রকৃতি', 'মৈত্রী' বা 'অন্তরঙ্গ'-এর মতো লিটল ম্যাগাজিনগুলো আজ কুইয়ার অধিকার কর্মীদের লেখার সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম।"
উপসংহার
রাত্রি তখন গভীর। জানলার বাইরের বৃষ্টি থামিয়া গিয়াছে। শৌনক তাহার ল্যাপটপের স্ক্রিন বন্ধ করিল। উমাপ্রসাদের সেই পুরনো ডায়েরিটা সে বুকে জড়াইয়া ধরিল।
কালের নিয়মে উমাপ্রসাদ এবং তাঁহার বিমল কালের গহ্বরে হারাইয়া গিয়াছেন সত্য, কিন্তু তাঁহাদের সেই অবদমিত কান্না, সেই লুকিয়ে থাকা প্রেম আজ আর অপরাধ নয়। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ৩৭৭ ধারা আজ বাতিল হইয়াছে। সমাজ হয়তো পুরোপুরি বদলায় নাই, কিন্তু সাহিত্যের আয়নায় আজ কুইয়ার মানুষেরা নিজেদের মুখ স্পষ্ট দেখিতে পান।
হৃদয়ের গতি বড় বিচিত্র। সে কোনো আইনের ধার ধারে না, কোনো সামাজিক শৃঙ্খল মানে না। সে কেবল নিজের সত্যকে চেনে। উমাপ্রসাদের ডায়েরির পাতাগুলো হয়তো সময়ের ধুলোয় একদিন জীর্ণ হইয়া যাইবে, কিন্তু মানুষের আত্মপরিচয় এবং ভালোবাসার এই অনন্ত লড়াই সাহিত্যের পাতায় অমর হইয়া থাকিবে।
কালের গর্ভে চাপা পড়া সেই দীর্ঘশ্বাস আজ যেন এক মুক্ত আকাশের নিচে রামধনু হইয়া ফুটিয়া উঠিয়াছে।