নিশান

আমার হাত বান্ধিবি, পা বান্ধিবি, মন বান্ধিবি কেমনে?

শ্রুতি চক্রবর্তী

"খুঁজি তারে আসমান জমিন,আমারে চিনি না আমি"

এই গানের দুটো লাইন শুনলেই মনে পরে যায় "সমান্তরাল" ছবিটির কথা।চোখের সামনে ভেসে ওঠে ছবির কিছু চিত্র। শুধু মাত্র পরিবারের সম্মান রক্ষার্থে কি ভাবে দিনের পর দিন কিছু মানুষের মনকে বন্ধক রাখতে হয় বাস্তবতার কাছে, ওরা পায়না খোলা আকাশের দেখা। প্রাণ খুলে নিঃশ্বাস নেওয়ার অধিকার যেন কেউ কেড়ে নিয়েছে তাদের থেকে।

কারণ একটাই,তারা বাকিদের মতন সমাজের তৈরি করা কিছু ছাঁচে নিজেদের ফেলতে পারে না। নশ্বর দেহের মাধ্যমে তারা প্রকাশ করতে পারে না তাদের মনের ভাষা।

তবে এই চিত্র কি শুধু সিনেমার পর্দায় দেখা যায়?

না,সারা ভারতে ২০০৮ থেকে ২০২১ পর্যন্ত "অনার কিলিং" এর দ্বারা মৃত্যু ঘটেছে ১০২ জন তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তির। উত্তর ভারত এবং সারা ভারতের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে এর সংখ্যা বেড়ে চলেছে দিনের পর দিন। সমাজের ঠিক করে দেওয়া কাঠামোর বাইরে যাওয়া টা অনেকেই মেনে নিতে পারে না।সেখানে আজ আমর যতই আধুনিক হয়ে উঠি না কেনো,আমরা কি সত্যিই পেরেছি আত্মীয় স্বজন,পরিবার, আমাদের চারপাশের সমাজটাকে ঠিক ততটাই আধুনিক করতে? প্রগতিশীল করে তুলতে।

LGBTQ+ কনসেপ্ট টুকু শোনাও যেন তাদের কাছে পাপ! তাতে অবশ্য সম্পূর্ণ ভাবে তাদের দোষারোপ করা যায় না। এই সমাজ, এই রাষ্ট্র কাঠামো ব্যর্থ তাদের মননে প্রগতিশীলতার চাষ করতে।

পরিবারের চাপে কেউ নিজের মনের কথা সবার সামনে তুলে ধরতে ভয় পায় অথবা কেউ সেই বাড়ির "rebel kid" হতে গিয়ে পায় মানসিক রোগীর তকমা। যাদের সাথে বেড়ে ওঠা,যাদের হাতে হাত ধরে প্রথম চলতে শেখা সেই মানুষ গুলোও যেন ভিন গ্রহের প্রাণীর মতন দূরত্ব বাড়িয়ে নেয়।

যে কোনও বেসিক বায়োলজির বই ঘাঁটলে দেখা যায় এর প্রধান কারণ হলো হরমোনাল ইমব্যালেন্স এবং কিছু ক্ষেত্রে chromosomal disorder। তবে আজকের দিনে দাঁড়িয়েও এই সহজ সত্যিটা আমরা মেনে নিতে পারি না। প্রকৃতির স্বাভাবিকতাকে প্রতিনিয়ত গ্রাস করে চলে আমাদেরই মাঝে, আমাদেরই হাতে বেড়ে ওঠা সামাজিক রক্ষণশীলতা।

পুরাতন সময় থেকে চলে আসা এই কনসেপ্টকে বরণ করে নিতে যে সমাজের এতোই দ্বন্দ্ব, তাকে চৌকাঠ পেরিয়ে ঘরে নিয়ে আসা এখনো সহজসাধ্য হয়নি। এই সমাজই তো বাল্যবিবাহ রদ করেছে, সতীদাহ প্রথা বন্ধ করেছে, বিধবা বিবাহ চালু করেছে। তাহলে তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতিতে এতো সমস্যা কেন? যা কিনা আমাদের পুরান অবধি স্বীকৃতি দেয়। এই বাঁধন গুলো ছিন্ন করে যদি বেরিয়ে আসা যায় তবে নারী পুরুষ বাদেও যে তৃতীয় লিঙ্গের অস্তিত্ব রয়েছে সেটা মেনে নেওয়া আজও এত কঠিন কেনো?

কেনো আজও সমাজ ঠিক করে দেবে যে, পুরুষেরা কষ্ট পেলে কাঁদে না?

কেনো বলে দেবে একটা মেয়ে কোনো এক বিশেষ দিনে শাড়ি পড়বে না শার্ট প্যান্ট?

একবিংশ শতাব্দী তে দাঁড়িয়ে একজন ব্যক্তির পরিচয় কী শুধুই সে নারী কিংবা পুরুষ?

প্রশ্ন গুলো থেকে যায়। উত্তর খোঁজার অবকাশ নেই। উত্তর দেওয়ার কেউ নেই। আছে শুধুই আর্তনাদ। পরিচয়ের স্বীকৃতির আর্তনাদ। স্কুল,কলেজ,কর্মক্ষেত্রে চলে অবিরাম অপমান,সমালোচনা।

চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে একটু মেয়েলি ভাবে কথা বলা ছেলেটিকে নিয়ে আজও হাসাহাসি হয়। পাড়ার মোড়ে চলে বৈঠক। দুটো ছেলে কে সিনেমা হলে অথবা পার্কে ঘনিষ্ঠ ভাবে দেখলে আমাদের মধ্যে থেকে তাচ্ছিল্যের হাসি টা ঠিক বেরিয়ে পরে। জুন মাসে সাতরঙা পতাকার ছবি ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা টা এখন শুধুই একটা ট্রেন্ড। পাশের ঘরে ঘুমিয়ে থাকা ছোট্ট মেয়েটি যখন ঘুম থেকে উঠে তার বাবার মতন চুল আঁচড়ে স্কুলে যেতে চায়,তার কপালে চর থাপ্পড় আর গালাগালি ছাড়া কিছুই জোটে না।

যেই ভারতের বুক থেকে স্পেসশিপ চাঁদে পৌঁছে যাচ্ছে প্রাণের খোঁজে,সেই ভারতের বুকে দাঁড়িয়ে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের আজও ট্র্যাফিক জ্যামে দাঁড়িয়ে পয়সা রোজগার করতে দেখা যায়।

চিকিৎসা বিজ্ঞান যেখানে ক্যান্সার এর ওষুধ বানাতে ব্যস্ত,সেইখানে দাঁড়িয়ে আমরা আমাদের মস্তিষ্কের ক্যান্সারই হয়তো দুর করতে পারি নি।

দেশের শীর্ষ স্থানে বসে থাকা চরম ফ্যাসিস্ট সরকার কেড়ে নিচ্ছে তাদের পরিচয়ের অধিকার। ট্রান্স বিল সংশোধনীর আড়ালে স্বীকৃতি আদায়ের লাইনে দাঁড় করিয়েছে রাষ্ট্র। যেখানে প্রতি বছর "Subh mangal zyada savdan","নগর্কীর্তন" এর মতন ছবি দেখানো হয় বড় পর্দায়,সেখানে আজও আমরা নিজেদের ছোট মানসিকতার মধ্যেই আটকে।

এই মানুষ গুলি কি আরেকটু সুন্দর বাসযোগ্য একটা পৃথিবী পেতে পারে না? থাক না কিছু পার্থক্য। সমান্তরাল রেখার মতন একসাথে কি আমরা অনেক টা পথ চলতে পারি না? বানাতে পারি না একটা ভালোবাসার দেশ?

"প্রশ্ন গুলো সহজ,আর উত্তর ও তো জানা।"

পৃথিবীর বুকে যতবার সমাজের নিয়ম আমাদের গ্রাস করে খেতে আসবে ততবার আমাদের নিজেদের অধিকারের কথা বলে যেতে হবে। বুঝিয়ে দিতে হবে প্রথম এবং দ্বিতীয় লিঙ্গের মতন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ ও সমান ভাবে স্বাভাবিক। গড়ে তুলতে হবে প্রতিরোধ,করে যেতে হবে প্রতিবাদ। ছিনিয়ে আনতে হবে পরিচয়ের স্বীকৃতি। এই মানুষ গুলোর জন্য বলে যেতে হবে সাম্যের কথা,ভালোবাসার কথা।

শুধু জুনে মাসের কয়েকটা দিন না,রামধনু পতাকা টা যেন সারাবছর, সর্বসময় মাথা উঁচু করে উড়তে পারে।

মনের ভাব শুধু মন প্রকাশ করুক,বাইরের আভরণ টা না হয় ঐচ্ছিক থেকে যাক।

এই ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ওদের পা বাঁধবে, হাত বাঁধবে, কিন্তু মন? সেটা কেমন করে বাঁধবে? যে মনে লেগে আছে সাত সমুদ্দুর ভালোবাসা। যে ভালোবাসা দিয়ে আস্ত দুনিয়া জেতা সম্ভব। ফ্যাসিস্টদের হারানো তো আরও সম্ভব!